প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১২:৩৬ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

“গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ” এর আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ১০ দফা ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলন

পলাশ চন্দ্র দাস 
গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকার, কর্মসংস্থান,  সামাজিক সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে  ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির  মিলনায়তনে (৩০ আগস্ট)  রবিবার বিকাল ৩ টায়   ১০ দফা ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে “গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ”  -এর আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। 
উক্ত  সংবাদ সম্মেলনে  মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের আহবায়ক ও বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সংগ্রামী সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন -  যুগ্ম আহবায়ক জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মো: শফিকুল ইসলাম, যুগ্ম আহবায়ক ও গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্রের সভাপতি সাহিদা সরকার, যুগ্ম আহবায়ক জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো: রফিক, বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেসের সভাপতি শামীমা আক্তার, সবুজ বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি  ইসমাইল হোসেন ঠান্ডু, বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক  আব্দুল্লাহ আল বাছির, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি, সান্তনা ইসলাম, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুন নাহার, গণতান্ত্রিক গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো: আব্বাস উদ্দিন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল আহাদ, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোঃ সোহেল রানা মিঠু প্রমুখ। তারা তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেন - বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস শিল্প। দেশে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক কর্মরত। এর বড় অংশ হচ্ছে নারী শ্রমিক। এই বিপুল শ্রমিক জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বর্তমানে তারা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিক ছাঁটাই, কারখানা বন্ধ, বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিয়ম, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি। ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে দেশের তৈরি পোষাক খাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছাটাই বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় শতাধিক কারখানা বন্ধ ও গণছাটাইয়ে কারণে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
এমতবস্থায়,  গার্মেন্টস শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকের ন্যায্য ও জীবনযাপনযোগ্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা, সময়মতো বেতন-বোনাস, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই এই শিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হবে। মালিক-শ্রমিকের ন্যায্য স্বার্থের সমন্বয়, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সময়মতো মজুরি প্রদান, শ্রম আইন যথাযথ বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। তাছাড়া, গার্মেন্টস শ্রমিকের অধিকার, কর্মসংস্থান সামাজিক সুরক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানউন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা ১০টি গার্মেন্টস ফেডারেশনের ঐক্যমতের ভিত্তিতে "গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ" সাথে যুক্ত সংগঠনসমূহ হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন-(বি-২১৬৯), গার্মেন্টস দর্জি শ্রমিক কেন্দ্র-(ঢাকা ৪৯০২), সবুজ-বাংলা গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন-(বি-২২৩৪), জাতীয় গার্মেন্টস-সোয়েটার শ্রমিক ফেডারেশন, মাদারল্যান্ড গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (বি-২১৯৮), বাংলাদেশ লেবার কংগ্রেস-(বি-২১৯৭), বাংলাদেশ গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন-(ডি-৪৭৭২), জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন-(ডি-৪৭৭২), গণতান্ত্রিক গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।
তারা আরো বলেন - 'গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চ' মনে করে বর্তমানে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের বেতন সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ব্যয় মেটানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, পর্যাপ্ত খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে শ্রমিক পরিবারে সদস্যরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং ভালো চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অপর্যাপ্ত আয়ের কারণে অনেক শ্রমিককে ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক ব্যয় কমিয়ে অত্যান্ত মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে ক্রমবর্ধমান বাসাভাড়াও শ্রমিক পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তারা বলেন, শ্রমিকের "মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এটি শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার।” শ্রমিক ও তার পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে শুধু প্রচলিত' Minimum Wage' নয়, বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় Living Wage বা জীবনধারণ উপযোগী মজুরি নির্ধারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরী। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ১৩৯ (৬) অনুযায়ী নির্ধারিত নিম্নতম মজুরি প্রতি তিন বছর অন্তর পুননির্ধারণের বিধান রয়েছে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য বর্তমান ১২,৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় এবং ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ এ গেজেট প্রকাশিত হয়। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি পুননির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা জরুরি। অবিলম্বে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন এর কার্যক্রম শুরু করতে আমরা গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি জোর দাবী জানাচ্ছি।
গার্মেন্টস শ্রমিক উন্নয়ন মঞ্চের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবীসমূহ নিন্মরূপ-
১. অবিলম্বে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পূর্নগঠন করতে হবে এবং জীবন যাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নূন্যতম মজুরি পুননির্ধারণ করতে হবে।
২. সকল বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু করতে হবে এবং অন্যায় ও বেআইনি শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে।
৩. শ্রমিককে কোন পর্যায়েই কালো তালিকাভুক্ত করা যাবে না এবং কালো তালিকাভুক্তির নামে শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও অধিকার হরণ বন্ধ করতে হবে।
৪. শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলাসমূহ দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং শ্রমিকদের ন্যয়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৫. অবিলম্বে প্রয়োজনীয় শ্রম বিধিমালা প্রনয়ণ ও কার্যকর করতে হবে এবং শ্রম আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
৬. গার্মেন্টস শিল্পে নিরবিচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবারহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন ব্যবস্থা সচল থাকে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হয়।
৭. মাতৃত্বকালীন ছুটি ন্যূনতম ৬ মাস করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ, সাশ্রয়ী আবাসন, চিকিৎসা, পরিবহন, রেশনিং ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. শ্রমিকদের অবাধে সংগঠিত হওয়া, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকার বাস্তবে কার্যকর করতে হবে এবং এ কারণে কোন ধরনের হয়রানি বা চাকরিচ্যুতি করা যাবে না।
১০. জীবন যাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবছর গার্মেন্টস শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে তারা আরও জানান,  উপরোক্ত দাবী আদায়ের লক্ষে মঞ্চের উদ্যোগে ঢাকা, আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম শিল্প এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হবে।

মন্তব্য করুন