প্রকাশিত: ৫ ঘন্টা আগে, ১২:৫৯ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মিজানুর রহমান লিটন
ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, জৈব সার, বায়োগ্যাস, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে একটি ‘জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর সরকারের ব্যয়ও বাড়ছে। আগামী বছর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেই প্রায় ৪৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে।
এ অবস্থায় বর্জ্যকে শুধু ব্যবস্থাপনার বোঝা হিসেবে না দেখে তা থেকে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত আমিনবাজার প্রকল্পে প্রায় ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হচ্ছে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ২৫ টাকা হতে পারে। অথচ বর্তমানে বিদ্যুতের গড় উৎপাদনমূল্য প্রায় ১২ টাকা প্রতি ইউনিট। ফলে প্রচলিত উৎপাদনমূল্যের তুলনায় আমিনবাজার প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম প্রায় দ্বিগুণ।
এ কারণে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম দিয়ে প্রকল্পটির লাভ-ক্ষতি নির্ধারণ করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমানো এবং বর্জ্য থেকে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার, বায়োগ্যাস, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২৫০ টন জৈব সার উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ২৭৪ কোটি টাকা হিসেবে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় প্রতিবছর বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর এর আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করা গেলে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে এসব পণ্য বিক্রি করে আয়ও করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির পরিকল্পনায় আমিনবাজার ল্যান্ডফিলকে ধীরে ধীরে একটি সমন্বিত ‘জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্টে’ রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, সার, বায়োগ্যাস ও জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন উপাদান কাজে লাগানোর ব্যবস্থা থাকবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকল্পটির মেয়াদ ও সম্পদের মালিকানা। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় প্রকল্প পরিচালনার পর ১৫ বছর শেষে পুরো প্ল্যান্ট সরকারের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটির মূল্যায়নে শুধু প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদনমূল্য বিবেচনা করলে হবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট বিনিয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়, বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয়, জৈব সার, বায়োগ্যাস ও জ্বালানি বিক্রির সম্ভাব্য আয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর সরকারের কাছে প্ল্যান্ট হস্তান্তরের বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।
ফলে আমিনবাজার প্রকল্পের মূল প্রশ্ন শুধু বিদ্যুৎ ২৫ টাকা ইউনিটে উৎপাদন হচ্ছে কি না—তা নয়। বরং প্রতিটি টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে মোট কত টাকার সম্পদ তৈরি করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমে সরকারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কতটা কমানো যাবে—সেই হিসাবই প্রকল্পটির প্রকৃত অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন