প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আলি জামশেদ, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে শূন্যতা ও লোকবল সংকটের মধ্যেই কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নৌপথে বাড়ছে অপরাধ। ডাকাতি, মাদক কারবার ও অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা ও ধনু নদীর বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চললেও নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝে মধ্যে নামমাত্র জেল ও জরিমানা করা হলেও বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন।
সর্বশেষ একজন ছাত্রসহ মোট ৮ জনকে ২৭ আগস্ট গ্রেফতার করা হলেও রহস্যময় কারণে ৩ জনের নামে মামলা হয়। গুঞ্জন উঠেছে অপরাধীদের ছাড়াতে নানা মহল থেকে ব্যস্ত সুপারিশে ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল সংকটের সুযোগে নৌপথকেন্দ্রিক অপরাধ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে একদিকে নদী ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে পড়ছেন নৌপথে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ ও পর্যটকরা।
নিকলী উপজেলায় বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড), অফিসার ইনচার্জ (ওসি), সার্কেল অফিসার ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নেই। উপজেলার একমাত্র কলেজের অধ্যক্ষ পদও শূন্য। একই সঙ্গে ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ বিভিন্ন সেক্টরে রয়েছে লোকবল সংকট। ফলে ভারপ্রাপ্ত ও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে হাওরের নৌপথে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৬ আগস্ট বিকেলে আবুল কালাম আজাদ নামের এক ব্যক্তিকে ৭ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ একটি ছইযুক্ত ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকাসহ চামড়া বন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌ-পুলিশের একটি দল। উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ২৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
এর আগে ১৮ আগস্ট চামড়া ঘাট এলাকায় পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতির প্রস্তুতি রোধে নৌ-পুলিশের একটি দল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ২৯ জুলাই হাওরের একটি বাল্কহেডে ডাকাতি, ৮ জুলাই ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়নের শেরপুর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় দুর্ধর্ষ ডাকাতি এবং ৭ জুলাই বালিখলা থেকে মিঠামইনের ঘাগড়া যাওয়ার পথে একটি লাশবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, ঘোড়াউত্রা ও ধনু নদীর বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের ভাষ্য, একেক সময় নদীর একেকটি পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যে জরিমানা করা হলেও তাতে কার্যত বন্ধ হচ্ছে না বালু উত্তোলন। এতে নদীর তীরবর্তী মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিংপুর ইউনিয়নের এক নৌশ্রমিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একাধিক নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে একেকবার একেকটি ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। নামমাত্র জরিমানা করা হলেও এর সঙ্গে জড়িতরা থেমে নেই। তাঁর দাবি, এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
নিকলী উপজেলা সদরের একাধিক নেতাকর্মী ও সচেতন মহলের ভাষ্যেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের বক্তব্যে সাবেক নিকলী উপজেলা চেয়ারম্যান মোকাররম সর্দারসহ স্থানীয় কিছু ক্ষমতাসীন নেতাকর্মীর নামও এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মোকাররম সর্দারের নাম প্রকাশ্যে বলতে নারাজ। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। তবে মামলার প্রসঙ্গে মোকাররম সর্দারের নাম এসেছে কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান তাঁরা।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও ঢাকার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জের ব্যবসায়ী মোকাররম সর্দারকে ২৭ আগস্ট বেলা ৫টার দিকে একাধিকবার তার ব্যক্তিগত ০১৭১৮২৬৭৪৯৩ নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বালু উত্তোলন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি ও অভিযোগ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না। তাঁদের ভাষ্য, নামমাত্র জরিমানা বালু উত্তোলন বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না; বরং এতে জড়িতরা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।
মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী নৌ-পুলিশের দায়িত্বে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) বিদ্যুৎ কুমার দাশ বলেন, ২৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ‘তাজ নুসরাত’ নামের একটি ড্রেজার মেশিনসহ কয়েকজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এলি মধ্যে ৩ জনের নামে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি আরও জানান, ড্রেজারটির মালিক বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার নজরুল ইসলাম। আর চালকের নাম ফরহাদ হোসেন। তবে বালু উত্তোলনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ড্রেজারে অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হচ্ছে।
ইটনা থানার অফিসার ইনচার্জ হাবিব উল্লাহ খান ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকার কথা জানিয়ে দায়িত্বে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর শফিকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সাব-ইন্সপেক্টর শফিকুল ইসলাম জানান, নৌপথে চাঁদাবাজির অভিযোগে ২৭ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে ইটনা উপজেলার এলেনজুড়ি এলাকা থেকে বাবর আলী নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে নিকলী উপজেলার প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে শূন্যতা, বিভিন্ন সেক্টরে লোকবল সংকট, হাওরের নৌপথে সাম্প্রতিক অপরাধ বৃদ্ধি এবং অব্যাহত বালু উত্তোলনের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের বক্তব্য জানতে ২৭ আগস্ট বিকেলে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা ও লোকবল সংকটের মধ্যে হাওরের নৌপথে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা কবে নেওয়া হবে? বিশেষ করে বারবার অভিযান ও জরিমানার পরও যদি নেপথ্যের কারিগররা অধরাই থেকে যান, তাহলে নদী, পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব—এ প্রশ্নই এখন সামনে এনে দাবি স্বরূপে উপস্থাপন করেন।
মন্তব্য করুন