প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০৯:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
পলাশ চন্দ্র দাস, স্টাফ রিপোর্টার
সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (CePAA) এর উদ্যোগে আজ শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল ১০ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে "রাষ্ট্র গঠন ও আমলাতন্ত্র: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা” শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপের আয়োজন করা হয়। সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (CePAA) এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ শরিফুল আলম এ সংলাপে সভাপতিত্ব করেন এবং বিশিষ্ট গভ্যার্ন্যান্স গবেষক ও সিভিল সার্ভিস বিশেষজ্ঞ ড. ইউসুফ জারিফ কর্তৃক লিখিত মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাফিউল ইসলাম।
এ সংলাপে সাবেক সচিব ও গবেষক ড. মাহফুজুল হক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খন্দকার রাশেদুল হক, সাবেক সচিব জনাব মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, সাবেক সচিব মিজ আলেয়া আক্তার, সাবেক সিনিয়র সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, দৈনিক ওয়াদার প্রধান সম্পাদক শফিকুল আলম, অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম প্যানেলিস্ট হিসাবে বক্তব্য রাখেন।
মূল প্রবন্ধে বিভিন্ন গবেষণার উদাহরণ দিয়ে বলা হয় যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিতে পেশাদার ও রাজনীতিমুক্ত আমলাতন্ত্রের ব্যাপক ভূমিকা ছিল। জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিংগাপুরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলা হয় মেধাকে উপেক্ষা করে সুষ্ঠু আমলাতন্ত্র গড়া যায় না। মূল প্রবন্ধকার বলেন যে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে আইনগত ভাবে আমলাতন্ত্রকে নতজানু করা হয়েছে এবং সকল শাসক আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকীকরণ করেছে। ড. ইউসুফ জারিফ মূল প্রবন্ধে দাবী করেন যে শাসক শ্রেণি নির্বাচন ব্যবস্থা কুক্ষিগত এবং রাষ্ট্র ও সরকারি নীতিকে গোষ্ঠী স্বার্থে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকীকরণ করে। জুলাই বিপ্লবের পরেও রাজনীতিকীকরণ ও মেধা উপেক্ষার নীতি চলমান আছে।
তিনি বলেন যে আমলাতন্ত্রকে পেশাদার না করলে দেশে সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তিনি আরো বলেন যে সিভিল সোসাইটি'র একটি অংশ রাজনৈতিক অভিলাষ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের এজেন্ডার অংশ হিসাবে আমলাতন্ত্রকে দূর্বল করতে চায়। মূল প্রবন্ধকার ড. ইউসুফ জারিফ আমলাতন্ত্রকে সুরক্ষার জন্য কয়েটি সুনিদিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন: (১) বিভিন্ন দেশের মেরিট প্রটেকশন কমিশনারের মতো বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস Ombudsman প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মকর্তাগণ প্রতিকার পায়; (২) সচিব এবং সংস্থা প্রধান নিয়োগে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা আনতে হবে। এ কমিটি আবশ্যিকভাবে সরকার ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে গঠিত হবে। কমিটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নৈতিকতা ও সততা, আর্থিক অবস্থা ও সম্পদ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রাসংগিক দক্ষতা বিশ্লেষণ করে মতামত দিবে; (৩) বর্তমান বাস্তবতায় সিনিয়র সিলেকশন বোর্ড বা এসএসবি'র কোন নৈতিক কার্যকারিতা দেখা যায় না। এসএসবি রাজনৈতিক আজ্ঞাবহ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিংগাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো প্রশাসনিক কাঠামো গড়া যায় কীনা তা বিবেচনা করতে হবে; পদায়ন ও পদোন্নতির নীতিমালাকে স্পষ্ট করতে হবে এবং তা পাবলিক ডকুমেন্ট হিসাবে প্রদর্শন করতে হবে। নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গ্রহণকে আবশ্যিকভাবে বাদ দিতে হবে; (৪) জাতীয় সংসদে বিরোধীদল কর্তৃক পদোন্নতি প্রাপ্ত অথবা পদোন্নতি বঞ্চিতদের ক্রেডেন্সিয়াল উপস্থাপনের জন্য সরকারি দলকে বাধ্য করতে হবে। পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাগণ কী কারণে বঞ্চিত হয়েছে তা তথ্য অধিকারের অংশ হিসাবে কর্মকর্তাগণকে জানাতে হবে; (৫) সিভিল সার্ভিসের জন্য অবশ্য পালনীয় 'নৈতিক ও জবাবদিহি নীতিমালা' তৈরি করতে হবে এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যান্য আলোচকগণ বলেন যে বিগত সরকারসমূহ দলীয় স্বার্থে আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করেছিল, ফলে দেশ থেকে নির্বিচারে অর্থ পাচার হয়েছে এবং নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। আমলাতন্ত্র যাতে দায়বদ্ধ হয় এবং নৈতিক শক্তি ও পেশাগত দক্ষতায় শক্তিশালী হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত আমলাতন্ত্র দ্বারা সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন সম্ভব নয় মর্মে আলোচকগণ অভিমত ব্যক্ত করেন। আলোচকগণ আরো বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পয়ল সিস্টেমের অপব্যখ্যা দিয়ে আমলাতন্ত্রে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। আলোচকগণ অভিমত ব্যক্ত করেন যে গত অন্তবর্তী সরকারের আমলে চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক সচিবের চুক্তি বাতিল হলেও জনপ্রশাসন সচিব এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবের চুক্তি বাতিল হয়নি। এটি নির্বাচন নিয়ে ভিন্ন বার্তা দেয়। আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করার জন্য জাতীয় সংসদে কার্যকর পদেক্ষপ গ্রহণের জন্য বিরোধী দলের প্রতি আলোচকগণ আহ্বান জানান। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি কর্পোরেশনে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়োগের বিষয়ে আলোচকগণ বলেন যে জনপ্রশাসনকে সরকারি দলের অফিস করা হলে তা দেশের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে। সরকারকে এ প্রক্রিয়া থেকে ফিরে আসার জন্য তারা আহ্বান জানান। আলোচকগণ বলেন যে রাজনৈতিক আমলারা দিন শেষে সরকারকে সুরক্ষা দিতে পারে না। তার বড় প্রমাণ হচ্ছে জুলাই বিপ্লব।
মন্তব্য করুন