প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ০১:৫৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
রেজাউল করিম মজুমদার, গাজীপুর
বিগত সরকারের আমলে 'উন্নয়নের রোল মডেল' হিসেবে বিজ্ঞাপিত ঢাকা-গাজীপুর করিডোরের প্রথম ডেডিকেটেড বাস র্যাপিড ট্রানজিট বিআরটি প্রকল্প এখন একটি পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। প্রায় ৯৭ শতাংশ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করার পরও শুধুমাত্র ভুল নকশা, সমন্বয়হীনতা ও জেদের কারণে পুরো প্রকল্পটি স্ক্র্যাপ বা বাতিল করার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বর্তমান প্রশাসন।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল যার নেতৃত্বে ছিলেন, অধ্যাপক ড. মোঃ শামসুল হক গত মার্চ ২০২৬-এ সরকারের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করে যে, বিমানবন্দর-গাজীপুর রুটে বিআরটি চালু করা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। নকশাগত মারাত্মক ত্রুটির কারণে ডেডিকেটেড লেনে বাস নামালে উল্টো দীর্ঘস্থায়ী যানজট তৈরি হতো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এই ত্রুটি ও জনগণের দুর্ভোগের কথা একাধিকবার বিশেষজ্ঞরা জানালেও, তিনি একক ক্ষমতায় প্রকল্পটি জোরপূর্বক চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন, যা আজ সম্পূর্ণ অর্থহীন অপচয়ে পরিণত হলো।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রাস্তার মাঝখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত বিআরটি স্টেশন, ডেডিকেটেড লেনের ডিভাইডার এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো এখন পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হবে। অর্থাৎ, যে অবকাঠামো বানাতে ১৪ বছর সময় এবং জনগণের ট্যাক্সের ২৮১১ কোটি টাকা খরচ হলো, এখন তা ভাঙার জন্য আবারও রাষ্ট্রের বড় অঙ্কের টাকা গচ্ছা দিতে হচ্ছে। ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি নামক কোম্পানিটিকেও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ শামসুল হক এই প্রতিবেদনের জন্য দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, "যে প্রকল্পের ডিজাইন বা নকশাই ত্রুটিপূর্ণ, তা রাজনৈতিক প্রভাবে বছরের পর বছর টেনে নেওয়া সম্পূর্ণ অপরাধ। আমরা গবেষণায় দেখেছি, এখানে বাস চালু করলে গাজীপুর ও উত্তরার মানুষের ভোগান্তি কমার বদলে বহুগুণ বেড়ে যেত। শেখ হাসিনার সরকার বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন মতামতকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের ঠিকাদারী সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে এই প্রকল্প বাঁচিয়ে রেখেছিল। এখন প্রকল্প বাতিল করা ছাড়া কোনো টেকনিক্যাল উপায় ছিল না, কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয়ের দায় কার?"
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বিআইপি-এর পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এই ১৪ বছর ধরে সাধারণ মানুষ যে অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করল এবং এখন হুট করে প্রকল্প বাতিলের যে সিদ্ধান্ত এলো, এর পেছনেও গভীর কোনো স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত থাকতে পারে।
শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, এই প্রকল্প সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও কেড়ে নিয়েছে। ২০২২ সালের আগস্টে উত্তরার জসিমউদ্দীন রোডে বিআরটি প্রকল্পের ক্রেন থেকে গার্ডার ছিটকে পড়ে প্রাইভেটকারে থাকা একই পরিবারের ৫ জন নিহত হন। পুরো প্রকল্প জুড়ে মোট ৬ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন শুধুমাত্র চরম অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ঠিকাদার নিয়োগের শুরুতেই তৈরি করা হয়েছিল একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন।
আন্তর্জাতিক দরপত্রের নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে অন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়া হয়। বিশেষ শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করা হয়েছিল। কাজ পাওয়া চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো যে সমস্ত নথিপত্র জমা দিয়েছিল, তার অনেকগুলোই ছিল জাল এবং অতিরঞ্জিত। মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই ভুয়া নথিপত্রগুলোই বৈধ বলে গ্রহণ করা হয়।
বিআরটি প্রকল্পের টাকা সরাসরি বিদেশি ব্যাংকে এবং বিভিন্ন অফশোর কোম্পানিতে পাচার করা হয়েছে। নির্মাণ সামগ্রী, ভারী যন্ত্রপাতি এবং পরামর্শক ফি-র নামে প্রকৃত খরচের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। এই অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি চীনা মূল প্রতিষ্ঠান এবং হংকং, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে থাকা কর্মকর্তাদের বেনামী অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। কাগজে-কলমে বড় বড় কাজের দায়িত্ব চীনা প্রতিষ্ঠানের নামে থাকলেও, বাস্তবে তা নামমাত্র মূল্যে দেশীয় অনভিজ্ঞ সাব-কন্ট্রাক্টরদের দিয়ে করানো হতো। মাঝখানের বিশাল অঙ্কের ডলারের ফান্ড সরাসরি বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হতো। ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যে শত কোটি টাকার কমিশন দেওয়া হয়েছিল, তা হুন্ডির মাধ্যমে এবং ছদ্মনামের বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাচার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের হাতে আসা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, অভ্যন্তরীণ ইমেইল আদান-প্রদান এবং অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থ কোনো প্রকার কাজ ছাড়াই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। যার ফলে বছরের পর বছর সাধারণ মানুষ ভোগান্তি পোহালেও প্রকল্পের কাজ সময়মতো শেষ হয়নি এবং ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।
মন্তব্য করুন