প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ০৭:১৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আলিমুজ্জামান
সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি, কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য এবং ধরাকে সরা জ্ঞান করা এলজিইডির বহুল বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ মো: জামাল উদ্দিন (অলোক)-এর বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথি বেরিয়ে আসছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তন কিংবা গণঅভ্যুত্থান—কোনোকিছুই স্পর্শ করতে পারেনি এই দুর্নীতির বরপুত্রকে। একাধিকবার স্ট্যান্ড রিলিজ ও বদলি হলেও অলৌকিক ক্ষমতাবলে তিনি একই জায়গায় বহাল তবিয়তে থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন তার লুটপাটের রাজত্ব।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এলজিইডির এই অসাধু কর্মকর্তা সাধুতার মুখোশ পরে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বরিশাল সদরে অবস্থানকালে মেইন শহরের চকবাজার নূপুর সিনেমা হলের সামনে পিতার নামে জমি কিনে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেন তিনি। অথচ জিজ্ঞাসাবাদ এড়াতে চতুরতার আশ্রয় নিয়ে দাবি করেন এটি তার বাবার সম্পত্তি। এছাড়া বরিশাল সদর গার্লস স্কুলের সামনে ছালাম সাইকেল স্টোর গলিতে গড়ে তুলেছেন লেটেস্ট মডেলের আড়ম্বরপূর্ণ আরেকটি পাঁচতলা বাড়ি, যেখানে তার পরিবারসহ বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। পাশাপাশি নিজের একটি গাড়ির শোরুম ও একটি গাড়ির গ্যারেজ দেওয়ারও তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি বাবুগঞ্জেও রয়েছে তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি।
উপকূলের আয়রন ব্রিজে কোটি কোটি টাকার 'গ্যালভানাইজিং' জালিয়াতি
বরিশাল বিভাগে কার্যকালের সময় তিনি ১৯৬টি আয়রন ব্রিজের প্রাক্কলনে গ্যালভানাইজিং (জিংক প্রলেপ) করার নির্দেশ থাকলেও ঠিকাদারদের সাথে গোপন আঁতাত করে নামমাত্র নরমাল রং ব্যবহার করিয়েছেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্যাকেজ (যেমন: NG-IBRP/BARI/HIZ/REHAB/BRG-94, 95 সহ অন্যান্য) থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। নথিপত্র যথাযথ তদন্ত করলেই থলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অগাধ সম্পত্তি ও ক্ষমতার দাপট
বরিশাল জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর দোসর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হাসনাত পরিবারকে বড় অঙ্কের উপঢৌকন ও কমিশনের ভাগ দিয়ে নিজের স্থান শক্ত রেখে একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে গেছেন তিনি। ২০২৪ সালে ঢাকায় এলজিইডি সদর দপ্তরের আওতাধীন ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক (PD) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার বেপরোয়া আচরণ আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর কৌশল বদলে তিনি পিরোজপুরের পুরনো ঘটনা ও অন্যান্য প্রকল্প পরিচালকদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে নিজেকে ‘সাধু’ প্রমাণের চেষ্টা শুরু করেন। সাবেক পিডিদের অনুমোদন দেওয়া অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো আটকে রেখে বা সম্পন্ন না করার চক্রান্তে লিপ্ত থেকে সেগুলোকে পুঁজি করে নতুন করে রমরমা কমিশন ব্যবসা শুরু করেন অলোক।
ডিপিপি বহির্ভূত অনুমোদনের হরিলুট
কারিগরী ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং অনুমোদিত স্টিম (HOPE) ছাড়াই তিনি কমিশন চুক্তিতে গোপনে একের পর এক কাজের অনুমোদন দিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
রাজাপুর উপজেলা: প্যাকেজ নং- BRG 10, 11, 12
নলছিটি উপজেলা: প্যাকেজ নং- BRG 12
বরগুনা সদর উপজেলা: প্যাকেজ নং- BRG 5, 6
ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে এবং জালিয়াতি গোপন রাখতে সংশ্লিষ্ট নথি নিজ জিম্মায় আটকে রেখে কাউকে তা স্পর্শ পর্যন্ত করতে দিচ্ছেন না। তিনি ঢাকা অফিসে না বসে বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কার্যালয়ে বসেই সব ফাইলপত্র নিজ দখলে রেখে ঠিকাদারদের থেকে সরাসরি কমিশন আদায় করছেন।
স্বজনপ্রীতি ও শ্যালক সিন্ডিকেট
এই কমিশন বাণিজ্য নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে তিনি তার আপন শ্যালক লাভলু এবং বরিশাল সদর উপজেলার প্রকৌশলী শিবলু কর্মকারকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। কমিশন বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি ধরে রাখতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি ও পোস্টিং পাওয়ার পরেও প্রকল্প পরিচালকের পদ ছাড়তে নারাজ তিনি। নতুন প্রকল্প পরিচালকের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে অবৈধভাবে তা কুক্ষিগত করে রেখেছেন।
ক্ষুব্ধ ঠিকাদার সমাজ ও বিচারের দাবি
এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সততার সাথে কাজ করা সাধারণ ঠিকাদারগণ, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প। অবিলম্বে শরীফ মো: জামাল উদ্দিন (অলোক)-কে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মন্তব্য করুন