প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০১:৪১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

নারী হেনস্তা ও চাকুরীচ্যুত সিজনের গোপন পুনর্বাসন

সিটি ব্যাংকে চলছে মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেটের দাপট

পুলিশের আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সিআইডির মনিরুল, আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী ও ডিএমপি কমিশনার শফিকের সাথে মোতাসিম বিল্লাহ সিজন। আওয়ামী ১৭ বছরে মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেট বিদেশে এদের টাকা পাচার ও সংরক্ষণ করেছে। এই সিজন ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও আফতাব নগর জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটির নির্বাচনে এইসব পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে ভোট ডাকাতি করে পূর্ণ প্যানেলকে জয়ী করেছিলো

​নিজস্ব প্রতিবেদক
​আমানতকারীদের আস্থা, আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যাংকিং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'সিটি ব্যাংক'-কে যেন নিজেদের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিতর্কিত সহযোগী, বনানী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মোতাসিম বিল্লাহ সিজন। এই স্বৈরাচারী 'মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও বিতর্কিত শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের অবৈধ অর্থ লেনদেন, গোপন তহবিল সংরক্ষণ ও পাচারের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছে এই শক্তিশালী অক্ষ।

​সাধারণ কর্মকর্তা থেকে রাতারাতি ক্ষমতার শীর্ষে:

অনুসন্ধানে জানা যায়, নড়াইলে ছাত্রজীবনে শিবিরের রাজনীতি করা এবং গণমাধ্যমের কাছে গৌরবের সাথে তা স্বীকার করা মোতাসিম বিল্লাহ সিজন সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের এক সাধারণ কর্মকর্তা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। সেখান থেকে মাত্র কয়েক বছরেই তিনি অসীম ক্ষমতার মালিক হয়ে ওঠেন। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তাজুল ইসলাম এবং বিতর্কিত শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদ পাটোয়ারী, মনিরুল ইসলাম, আব্দুল বাতেন, শফিকুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান ও কৃষ্ণ পদ রায়ের মতো ব্যক্তিদের অবৈধ অর্থের মূল ব্যবস্থাপক ছিলেন এই সিজন। এসব প্রভাবশালী মহলের ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে ব্যাংকের ভেতরে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ভয়ের রাজত্ব গড়ে তোলেন তিনি।

​নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে এক বছরে জোড়া প্রমোশন:

ব্যাংকের জন্য বিশেষ কোনো সাফল্য বা দৃশ্যমান অবদান না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র এমডি মাসরুর আরেফিনের অন্ধ অনুগ্রহে ২০২১ থেকে ২০২২—মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দুটি প্রমোশন বাগিয়ে নেন সিজন। ২০২১-২২ সালে লোনের সেলস টিম লিডার থেকে তাকে প্রমোশন দিয়ে ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ে আনা হয় এবং একই বছর ২০২২ সালের জুলাইয়ে সরাসরি সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) বানিয়ে বনানী শাখার ব্যবস্থাপক পদে বসানো হয়। বিনিময়ে ব্যাংকের ভেতরের নানা অনিয়ম ধামাচাপা দিতে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তোপ থেকে ব্যাংককে বাঁচাতে তৎকালীন বিতর্কিত পুলিশ কর্তাদের আত্মীয়স্বজনকে সিটি ব্যাংকে চাকরি উপহার দিত এই সিন্ডিকেট।

বনানী শাখায়​নারী সহকর্মীকে হেনস্তা ও গোপনে পুনর্বাসনের নাটক:

এই সিন্ডিকেটের বেপরোয়া আচরণের চরম প্রকাশ ঘটে বনানী শাখায়। সিজন এক নারী সহকর্মীর ওপর চরম অসৌজন্যমূলক ও অশালীন আচরণ করেন। ঘটনাটির সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোরগোল উঠলে বাধ্য হয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তবে তৎকালীন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে উল্টো ইস্তফাপত্র জমা দেন সিজন। পরবর্তীতে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হলেও কোনো বিচারিক বা দাপ্তরিক সুরাহা ছাড়াই মাত্র ৯ মাসের মাথায় এমডি মাসরুর আরেফিন তার একক ক্ষমতাবলে অত্যন্ত গোপনে হেড অফিসে রিটেইল ব্যাংকিংয়ের
হেড অব স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্সেস অ্যান্ড পার্টনারশিপস পদ উপহার দিয়েছেন। অতি সম্প্রতি সিজনকে পুনরায় সিটি ব্যাংকে ফিরিয়ে এনেছেন। ব্যাংকের ভেতরের বড় বড় আর্থিক অনিয়ম, লুটপাট পরিচালনা এবং বাইরের সুবিধাবাদী গোষ্ঠীকে ‘ম্যানেজ’ করার কাজে সিজন অপরিহার্য হওয়ায় তাকে এভাবে ফিরিয়ে আনা হয়।

​আলাদিনের চেরাগ ও শতকোটি টাকার সম্পদ:
একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও সিজনের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে জ্যামিতিক হারে। ঢাকার আফতাব নগরে কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সেখানে রয়েছে যৌথ মালিকানার দামি প্লট। এছাড়া তৎকালীন পুলিশি শক্তি ব্যবহার করে আফতাব নগর জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটির নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে পুরো প্যানেল বিজয়ী করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কেবল তা-ই নয়, ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকের জব্দ করা ৫২ লাখ টাকা মূল্যের একটি টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি নিজ নামে কিনে নেন সিজন, যা সরাসরি ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ (Conflict of Interest) এবং ব্যাংক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া কোটি কোটি টাকা খরচ করে তিনি রাজধানীর অভিজাত বনানী ক্লাব ও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্যপদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

​স্বীকারোক্তি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের বিভ্রান্তি:
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিজন স্বীকার করেছেন যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নারী সহকর্মীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে তিনি বর্তমানে চাপে আছেন। স্বৈরাচারী আমলের পুলিশ কর্মকর্তাদের ফান্ড ম্যানেজ ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি কেবল ‘২৪ ঘণ্টার ক্রেডিট কার্ড সার্ভিস ও নেটওয়ার্কিং’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
​ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ও সচেতন মহলের মতে, সাধারণ মানুষের আমানত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেটের এই একচ্ছত্র অপশাসন ও শতকোটি টাকার দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। এমডি মাসরুর আরেফিন ও মোতাসিম বিল্লাহ সিজনের দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকের ক্ষুব্ধ কর্মী ও সাধারণ গ্রাহকেরা।

মন্তব্য করুন