প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১০:০৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
সারাদেশের মতো নানাভাবে চাঁদাবাজির শিকার রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সহস্রাধিক ঠিকাদার। রেলওয়ে দপ্তর থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি টেন্ডারের মূল বাজেটের ২%-৩% কমিশন দিতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। অন্যথায় টেন্ডার কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে ঠিকাদারদের।
ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপি ও নেতার নাম ভাঙিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন এই চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। যার মুলে রয়েছেন মাফিয়া ডনখ্যাত রেলখেকো ঠিকাদার শাহ আলম। যার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের কর্মী স্টুয়ার্ড মাহবুব রহমানকে (২০) গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭।
বর্তমানে সেই কর্মী জেলে থাকলেও অধরা রয়ে গেছেন এস এ কর্পোরেশনের কর্ণধার শাহ আলম। ঠিক একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের মাধ্যমে সদর্পে চাঁদাবাজি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। যা দেখার কেউ নেই। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের।
ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়শনের মাধ্যমে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রতিটি টেন্ডার থেকে কমিশন আদায় করতেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তখন তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন শাহ আলম। যিনি তখন খাঁটি আওয়ামী লীগার ছিলেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও স্থানীয় নেতাদের সাথে গা ঢাকা দেয়। ওই সময় থেকে বাবর পালিয়ে দুবাই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। এরপর ঠিকাদারদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসলেও তা বেশিদিন টেকেনি। কারণ বাবরের চাঁদাবাজির পুরোটাই দখলে নেন শাহ আলম। এই কথিত শাহ আলমই এখন বাবরের চাঁদাবাজি দেখভালের পুরোপুরি দায়িত্বে রয়েছেন। এজন্য তিনি দুর্দান্ত এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।
এক্ষেত্রে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি নেতা শফিকুর রহমান স্বপনকে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক হিসেবে সামনে নিয়ে আসেন। আর শাহ আলম হয়ে যান সদস্য সচিব। এ নিয়ে ঠিকাদারদের মাঝে অসন্তুষ দেখা দিলেও কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এই সুযোগে ঠিকাদার এসোসিয়েশন দখলে রাখতে কোনরকম নির্বাচনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।
ঠিকাদারদের মতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মিলে প্রায় এক হাজার ২০০ এর মতো রেলওয়ে নিবন্ধিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু নিবন্ধিত ঠিকাদার নিয়ে গঠিত ঠিকাদার এসোসিয়েশন সম্পূর্ণ অবৈধ। এই সংগঠনের কোন রেজিষ্ট্রেশন নেই। ফলে সংগঠন পরিচালনার কোন নিয়ম-নীতিও নেই। রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি কোন সময়। এর মুল কারণ লুটেপুটে খাওয়া।
সূত্র মতে, ঠিকাদারদের প্রাপ্ত টেন্ডার থেকে হাতিয়ে নেওয়া ২%-৩% কমিশনের অর্থ কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা ঠিকাদারদের কেউ জানে না। জানে শুধু শাহ আলম। যিনি এখন রেলের রাজা খ্যাত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মাফিয়া ডন শাহ আলম, ডিজে শাহ আলম, চাঁদাবাজ শাহ আলম, টেন্ডারের গডফাদার শাহ আলম ও ভুমিদস্যু শাহ আলম নামেও বিখ্যাত। আর এসব নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে সিরিজ অপরাধের বাস্তবিক সব গল্প।
ধারাবাহিক এই গল্পের দ্বিতীয় পর্বে চাঁদাবাজির গল্প শুনিয়েছেন ক্ষুব্দ ঠিকাদাররা। যারা নিজেদের নাম পরিচয় প্রকাশ করতেও ভয় পান। কারণ এই শাহ আলমের পেছনে সবচেয়ে বড় খুঁটি এখন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী। যাদের ভয়ে নিরব থাকেন রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। যারা শাহ আলমের কথামতো রেলওয়ের টেন্ডার দিতে বাধ্য হয়।
এছাড়া রেল ভবনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও রেলপথ মন্ত্রী-সচিবের সাথেও তার দারুণ সখ্যতার ভয় দেখান তিনি। এমনকি আত্নীয় পরিচয়ও দেন। বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের সময় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনকে আত্নীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি। মন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দেওয়া ছবি ফেসবুক ওয়ালে রেখে তা দেখাতেন তিনি।
কিন্তু ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রূপ পাল্টান বহুরূপী শাহ আলম। সুযোগ বুঝে তিনি এখন খাঁটি বিএনপি। রূপ বদলালেও স্বভাব বদলায়নি শাহ আলমের। বিএনপি পরিচয়ে রেলওয়ে ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক কমিটির নাম ভাঙিয়ে রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের বিভিন্ন খাত থেকে শুরু করেন চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি।
ঠিকাদাররা জানান, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ, সরঞ্জাম ক্রয় বিভাগ, ভু-সম্পত্তি বিভাগ, নিরাপত্তা বিভাগসহ সকল বিভাগের টেন্ডার থেকে ২% থেকে ৩% হারে চাঁদা আদায় করছেন তিনি। কিন্তু চাঁদাবাজির এই টাকা কোথায় যাই, কি করছে তার কোন হদিস নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, টেন্ডার পাওয়ার পর দাবিকৃত হারে নগদ টাকা চাঁদা বুঝিয়ে দিতে হয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের সদস্য সচিব শাহ আলমকে। অন্যথায় টেন্ডারের কার্যাদেশ পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হয় নানা কৌশলে। একইসাথে নির্দিষ্টহারে টেবিলে টেবিলেও ঘুষ দিতে হয়। ফলে বাজেটের ৬০ শতাংশও মিলে না বাস্তবায়ন কাজে।
অপর এক ঠিকাদার বলেন, রেলওয়ে থেকে প্রাপ্ত টেন্ডারের মূল বাজেট থেকে ২%-৩% কমিশন ঠিকাদার এসোসিয়েশনে জমা দিতে হয়। তা না হলে নিজের হাতে তৈরী করা টেন্ডার আর ঠিকাদারদের কপালে জুটে না। এই টেন্ডার পাওয়ার জন্য অন্য ঠিকাদারদের লেলিয়ে দেয় ঠিকাদার এসোসিয়েশনের দখলদার শাহ আলম। এক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ওপরও প্রভাব খাটান তিনি। এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতেও রাজী হননি রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঠিকাদাররা বলেন, প্রধান প্রকৌশলসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে প্রতি অর্থবছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার অবকাঠামোর উন্নয়ন কাজের টেন্ডার হয়। যেখান থেকে ২%-৩% হিসেবে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় ঠিকাদার এসেসিয়েশন। এই টাকা কোথায় যায়, কোন খাতে ব্যয় হয় তা কারোই জানা নেই।
এছাড়া শাহ আলম ঠিকাদার এসোসিয়েশন ও বিএনপি পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৌশল বিভাগ, কমার্শিয়াল বিভাগ থেকে নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের নামে বছরে আরও ৪০০-৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগিয়ে নেন। এ জন্য তাকে রেলের রাজা শাহ আলম, মাফিয়া শাহ আলম বলা হয়। আর এই চাঁদাবাজি ঘিরে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে, দুই পক্ষ শাহ আলমের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্তাধিকারি মো. শাহ আলম বলেন, ঠিকাদার থেকে কোন চাঁদা নেওয়া হয় না। তবে টেন্ডার থেকে ১% নেওয়া হয় বাৎসরিক পিকনিক বা ঠিকাদারদের সহযোগীতার জন্য। বিগত সময়ে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ৫% হারে চাঁদা নিলেও ভয়ে কেউ কোন কথা বলেনি। এখন আমার বিরুদ্ধে নেমেছে। অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি তার কোন সদুত্তর দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ঠিকাদার এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক শফিকুর রহমান স্বপন বলেন, ঠিকাদার এসোসিয়েশনের জন্য কিছু টাকা ঠিকাদাররা দেন, তবে ওই টাকা ফোর্স করে নেওয়া হয় না। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা এসোসিয়েশন করেছি, ঠিকাদারদের সহযোগীতা করার জন্য। সকল ঠিকাদার যেন ভালভাবে সমানতালে টেন্ডার পায় তা তদারকি করার জন্য।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টেন্ডার কাজ থেকে সংগৃহীত অর্থ ঠিকাদারদের সহযোগীতায় ব্যয় হয়। তবে এ বিষয়ে সবকিছু আমি মোবাইলে বলতে পারছি না। আপনার সাথে বসে কথা বলব। তবে শাহ আলম যদি আকাম করে তা হলে আমি তার সাথে নাই। আমি রাজনীতি করি, আমার এসব আকামের দরকার নাই।
প্রদত্ত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণকারী মো. শাহ আলম (এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী)-এর বিরুদ্ধে প্রধানতম অভিযোগগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
টেন্ডার ও বাজেট থেকে বাধ্যবাধকতামূলক ২%-৩% কমিশন আদায়: রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা ও চট্টগ্রাম মিলিয়ে) প্রায় ১,২০০ নিবন্ধিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে প্রতিটি টেন্ডারের মূল বাজেট থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ২% থেকে ৩% চাঁদা আদায় করা।
কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও হরিলুট:
শুধু প্রকৌশলসহ বিভিন্ন দপ্তরের বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের টেন্ডার থেকে বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে তা আত্মসাৎ করা।
অবৈধ পকেট কমিটি দখল ও চালনা:
কোনো সরকারি রেজিস্ট্রেশন বা নিয়ম-নীতি ছাড়া একটি অবৈধ ঠিকাদার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব পদ দখল করে রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার করা।
বহুরূপী রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার:
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের সহযোগীর পরিচয় ও তৎকালীন রেলমন্ত্রীর সঙ্গে সখ্যতা দেখিয়ে দাপট চালানো; এবং ৫ আগস্টের পর রাতারাতি রূপ বদলে বিএনপি পরিচয়ে পুনরায় টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা।
একচ্ছত্র টেন্ডার দখল (৪০০ কোটি টাকার কাজ ভাগানো): অ্যাসোসিয়েশন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠান 'এস এ কর্পোরেশন'-এর নামে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার একাই হাতিয়ে নেওয়া।
জোরজবরদস্তি ও হয়রানি:
দাবিকৃত কমিশন বা চাঁদা পরিশোধ না করলে কৌশল করে টেন্ডারের কার্যাদেশ আটকে দেওয়া এবং ভুক্তভোগী ঠিকাদারের পেছনে অন্য ঠিকাদার লেলিয়ে দিয়ে কাজের পরিবেশ নষ্ট করা।
সরকারি কাজের মান নষ্ট করা:
অ্যাসোসিয়েশনের কমিশন ও টেবিলে টেবিলে ঘুষ দিতে বাধ্য করায় ঠিকাদারদের কাছে মূল বাজেটের ৬০% টাকাও বাস্তবায়ন কাজে অবশিষ্ট থাকে না, যা অবকাঠামোগত মানকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
রেল কর্মকর্তা ও প্রশাসনে ভয়ভীতি প্রদর্শন:
প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মন্ত্রী-সচিব ও উচ্চপদস্থ রেল কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ও টেন্ডার দখলে রাখা।
মাদক ও অপরাধমূলক সংশ্রব:
তার প্রতিষ্ঠান 'এস এ কর্পোরেশন'-এর কর্মীকে প্রায় ৪,৮৫০ পিস ইয়াবাসহ ব্যাগভর্তি মাদকসহ র্যাব গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতা হিসেবে তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়া।
মন্তব্য করুন