প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৫:৪১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মাঠপ্রশাসনে বৈষম্যের ৫৫ বছর: পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যাচ্ছেন ৮৩০ প্রশাসনিক কর্মকর্তা

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঢাকায় স্মারকলিপি প্রদান করছেন বাংলাদেশ মাঠপ্রশাসন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি এস এম জাহিদুল ইসলাম

​বিশেষ প্রতিনিধি
​মাঠপ্রশাসনের কার্যালয়গুলোতে দিনরাত কাজের চাপ, মিটিংয়ের প্রস্তুতি, জাতীয় কর্মসূচির ফর্দ তৈরি এবং প্রটোকলের ভিড়ে প্রতিনিয়ত ঘাম ঝরান তারা। কিন্তু দীর্ঘ দুই থেকে আড়াই দশক একই পদে কর্মরত থাকার পর পদোন্নতির একটাও সোপান না দেখে খালি হাতেই বিদায় নিতে হচ্ছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও)-এর কার্যালয়ে কর্মরত প্রায় ৮৩০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কর্মজীবনে ‘পদোন্নতি’ শব্দটি আজও এক অধরা বাস্তবতা।

​স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৫ বছর পার হলেও তাদের জন্য কোনো ক্যারিয়ার প্ল্যানিং না থাকা কেবল বৈষম্যই নয়, চরম মানসিক নিপীড়নের রূপ নিয়েছে। এই দীর্ঘ বঞ্চনার চিরতরে অবসান ঘটাতে এবং কার্যকর পদসোপান অনুমোদনের দাবিতে অবশেষে সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক অভিভাবক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ চেয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে ‘বাংলাদেশ মাঠপ্রশাসন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি’। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট ২০২৬) দেশের ৮টি বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই স্মারকলিপি পেশ করা হয়।

​সচিবালয় বনাম মাঠপ্রশাসন: আইনের চরম দ্বিচারিতা

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে পদোন্নতি পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার এবং কাজের মানসিক অনুপ্রেরণার মূল উৎস। 'সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮'-এর ১৮ নম্বর ধারায় সব সরকারি কর্মচারীর কর্মজীবন পরিকল্পনা (Career Planning) সুনির্দিষ্ট করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু মাঠপ্রশাসনের বেলায় এই আইনের কার্যকর প্রতিফলন নেই।

​সবচেয়ে অদ্ভুত বিষাদময় দৃষ্টান্ত দেখা যায় সচিবালয়ের সাথে মাঠপ্রশাসনের সুযোগের বৈষম্যে। 'বাংলাদেশ সচিবালয় নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৪' অনুযায়ী সচিবালয়ে ২০তম গ্রেডের একজন সাধারণ কর্মচারী মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে পর্যায়ক্রমে ৯ম, ৮-৭ম ও অবশেষে উপ-সচিব (ক্যাডার বহির্ভূত, ৫ম গ্রেড) পর্যন্ত উন্নীত হতে পারেন। অন্যদিকে, সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাসের মাধ্যমে ১০ম গ্রেডে মাঠপ্রশাসনে নিয়োগ পেয়ে জীবনভর ওই ১০ম গ্রেডেই আটকে থাকতে হয়। কোনো কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে একই টেবিলে কাজ করে কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যাচ্ছেন।

​মাঠপ্রশাসনের পদোন্নতি বঞ্চনার মূল সারসংক্ষেপ:

​ভুক্তভোগী কর্মকর্তা: বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি ও ইউএনও কার্যালয়ের প্রায় ৮৩০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

​বাস্তবতা: ১০ম গ্রেডে যোগ দিয়ে দীর্ঘ ২০-২৫ বছর একই পদে স্থবির থেকে পদোন্নতিহীন অবসরে গমন।

​আইনি লঙ্ঘন: 'সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮'-এর ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ উপেক্ষিত।

​দাবি বাস্তবায়নের পথ: ৯ম গ্রেডে 'সেকশন অফিসার' ও ৭ম/৮ম গ্রেডে 'সিনিয়র সেকশন অফিসার' পদ সৃজন করা।

​কর্মশালার সুপারিশ ও ডিসি কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দী

এই তীব্র প্রশাসনিক বঞ্চনা নিরসনে একাধিকবার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বিগত ২৪ জুন ২০২৪ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত কর্মশালার সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, মাঠপ্রশাসনে এন্ট্রি পদ ১৬তম গ্রেডে নামিয়ে এনে ১০ম গ্রেড অতিক্রম করে ৯ম গ্রেডে 'সেকশন অফিসার' এবং ৭ম/৮ম গ্রেডে 'সিনিয়র সেকশন অফিসার' পদ সৃজন করা অতীব জরুরি।

​এমনকি 'জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৫'-এও মধ্যমেয়াদী সিদ্ধান্তের ৫ নম্বরে এই পদসোপান তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং উদ্যোগের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তগুলো ফাইলবন্দী হয়ে থমকে আছে।

​প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপই শেষ ভরসা

মাঠপর্যায়ে সরকারের গৃহীত হাজারো উন্নয়ন প্রকল্প ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা বাস্তবায়নের মূল শক্তি হচ্ছে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। তাদের মানসিক হতাশা দূর করা না গেলে সুশাসন ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

​তাই বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত ৯ম ও ৭ম/৮ম গ্রেডের পদসোপান অনুমোদন করার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অতি দ্রুত কার্যকর নির্দেশনা প্রদান করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সারা দেশের মাঠপ্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তাদের।

মন্তব্য করুন