প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বার, ২০২৬, ০৯:০৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

সিটি ব্যাংকে সিজনের পুনর্বাসন এমডি মাসরুর আরেফিনের স্বার্থে!

এমডি সিটি ব্যাংক মাসরুর আবেদিন ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোতাসিম বিল্লাহ সিজন

নিজস্ব প্রতিবেদক

​লাখো আমানতকারীর কষ্টার্জিত অর্থ, আর্থিক নিরাপত্তা ও দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সিটি ব্যাংক'কে নিজেদের লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে এমডি মাসরুর আরেফিন ও তার অনুগত শিষ্য মোতাসিম বিল্লাহ সিজন সিন্ডিকেট -একথা এখন ব্যাংক পাড়ায় মানুষের মুখে মুখে। সিজনের একের পর এক গুরুতর অপরাধ, সহকর্মী নিগ্রহ ও দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ মিললেও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে পরম স্নেহে আগলে রেখেছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মাসরুর আরেফিন। 
সম্পূর্ণ অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এই ‘মাসরুর-সিজন অক্ষ’-এর বেপরোয়া দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিদায়ী ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও বিতর্কিত শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের অবৈধ ও কালো টাকা পাচার, গোপন ফান্ড সংরক্ষণ এবং ভেতরের বেশ কিছু অপকর্ম বাস্তবায়নের মূল কারিগর ছিল এই চক্র।

​নড়াইলে ছাত্রজীবনে  সে সময় নিষিদ্ধ রাজনীতি করা সিজন সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের এক সামান্য কর্মকর্তা থেকে মাত্র কয়েক বছরেই অসীম ক্ষমতার মালিক হয়ে ওঠেন। সাবেক মন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তাজুল ইসলাম এবং বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা জাবেদ পাটোয়ারী, মনিরুল ইসলাম, আব্দুল বাতেন, শফিকুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমানের মতো স্বৈরাচারের দোসরদের অবৈধ বিপুল অর্থের মূল সমন্বয়ক ছিলেন এই সিজন- এমন  জনশ্রুতি রয়েছে খোদ সিটি ব্যাংকেই। ব্যাংকিং খাতে কোনো বিশেষ পারদর্শিতা বা অবদান না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র এমডি মাসরুর আরেফিনের অন্ধ অনুকম্পায় ২০২১ ও ২০২২—একই বছরে নিয়মভেঙে দুটি প্রমোশন বাগিয়ে নিয়ে সরাসরি সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) পদে বসে যান তিনি। বিনিময়ে ব্যাংকের শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ধামাচাপা দিতে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তোপ থেকে ব্যাংককে বাঁচাতে তৎকালীন পাওয়ারফুল পুলিশ কর্তাদের আত্মীয়স্বজনকে সিটি ব্যাংকে চাকরি উপহার দিত এই সিন্ডিকেট।

​এই সিন্ডিকেটের অমানবিক ও বেপরোয়া আচরণের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে বনানী শাখায়, তখন সিজন এক নারী সহকর্মীর ওপর চরম অসৌজন্যমূলক ও অশালীন নির্যাতন চালান। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য ছড়িয়ে পড়লে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে বাধ্য হয়ে তাকে শোকজ করা হয়। তবে তৎকালীন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে উল্টো পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বের হয়ে যান সিজন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তাকে তথাকথিত ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ পাঠানো হলেও, কোনো বিচারিক বা দাপ্তরিক সুরাহা ছাড়াই মাত্র ৯ মাসের মাথায় এমডি মাসরুর আরেফিন তার একক ক্ষমতাবলে অত্যন্ত গোপনে সিজনকে পুনরায় সিটি ব্যাংকে স্বসম্মানে পুনর্বাসিত করেন। ব্যাংকের ভেতরের বড় বড় আর্থিক অনিয়ম, অন্তর্মহলের লুটপাট পরিচালনা এবং বাইরের প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার কাজে সিজন অপরিহার্য বলেই তাকে এভাবে ক্ষমতার চেয়ারে ফিরিয়ে আনা হয়।

​একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও সিজনের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে জ্যামিতিক হারে। ঢাকার আফতাব নগরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যৌথ মালিকানায় কোটি কোটি টাকার প্লট এবং আফতাব নগর জহুরুল ইসলাম সিটি সোসাইটির নির্বাচনে পুলিশি ভয় দেখিয়ে ও গুম-নির্যাতনের হুমকি দিয়ে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে প্যানেল বিজয়ী করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকের জব্দ করা ৫২ লাখ টাকা মূল্যের টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি নিজ নামে কিনে নেওয়ার ঘটনা সরাসরি স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) ও ব্যাংক জালিয়াতি হলেও এমডির ছায়াতলে তিনি পার পেয়ে যান। কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে তিনি রাজধানীর অভিজাত বনানী ক্লাব ও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্যপদও বাগিয়ে নিয়েছেন।

​সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিজন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নারী সহকর্মীর সঙ্গে অমানবিক আচরণের কথা স্বীকার করলেও পুলিশ কর্তাদের কালো টাকা ফান্ড ম্যানেজ করার বিষয়টিকে কেবল ‘২৪ ঘণ্টার ক্রেডিট কার্ড সার্ভিস ও নেটওয়ার্কিং’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা করেন। 
এক টকশোতে সাংবাদিক মাসুদ কামাল সিটি ব্যাংক এমডি মাসরুর আবেদিনের বেতন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।

​আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেটের এই একচ্ছত্র অপশাসন, নারী নিগ্রহ ও শতকোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। এমডি মাসরুর আরেফিন ও মোতাসিম বিল্লাহ সিজনের দুর্নীতির মূল উপড়ে ফেলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকের সংক্ষুব্ধ কর্মী ও সচেতন সাধারণ গ্রাহকেরা। বিষয়টি সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়, দুদক,বাংলাদেশ ব্যাংক সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে দেয়া হলো।
 

মন্তব্য করুন