প্রকাশিত: ৭ ঘন্টা আগে, ১১:৩৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

মুঠো চাল থেকে হাজার মানুষের স্বপ্ন: ড. হোসনে-আরা বেগমের হাতে বদলে যাওয়া উত্তরবঙ্গের গল্প

মোঃ নুর ই আলম হোসেন

একসময় শুরুটা হয়েছিল খুব ছোট পরিসরে—গ্রামের দরিদ্র নারীদের এক মুঠো চাল সংগ্রহের উদ্যোগ থেকে। সেই সামান্য সঞ্চয়, কিছু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করার অঙ্গীকার ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি বিস্তৃত সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। আর সেই দীর্ঘ পথচলার অন্যতম প্রধান মুখ অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম—টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক।

বগুড়ার ঠেঙ্গামারা থেকে শুরু হওয়া তাঁর এই কর্মযাত্রা চার দশকের বেশি সময় ধরে বিস্তৃত হয়েছে নারী উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে। আজ টিএমএসএসের কার্যক্রম শুধু বগুড়া বা উত্তরবঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এর কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়েছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

টিএমএসএসের প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগমের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১ ডিসেম্বর বগুড়া জেলায়। শৈশবে তিনি বাঘোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোকুল তসলিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তৎকালীন সরকারি শাহ সুলতান কলেজে পড়াশোনা শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি উদ্ভিদবিদ্যায় এমএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের Washington International University থেকে Business Administration বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন বলে টিএমএসএসের জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৮০ সালে বগুড়ার মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন বলে টিএমএসএসের নথিতে উল্লেখ আছে। একই সময় তিনি ঠেঙ্গামারার দরিদ্র নারীদের নিয়ে সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন।

এক মুঠো চাল থেকে টিএমএসএস

ড. হোসনে-আরা বেগমের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় গুলোর একটি হলো টিএমএসএসের সঙ্গে তাঁর পথচলা।

পিকেএসএফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বগুড়া সদরের কাছে ঠেঙ্গামারা গ্রামের কিছু দরিদ্র নারী নিজেদের সহায়তার জন্য মুষ্টির চাল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেদের উদ্যোগে তারা খুব বেশি দূর এগোতে পারছিলেন না। সেই উদ্যোগকে বৃহত্তর ও সংগঠিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা থেকেই তাঁর টিএমএসএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা।

টিএমএসএসের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ সালে ১২৬ জন গ্রামীণ নারী ও ভিক্ষুকের কাছ থেকে মুষ্টি চাল সংগ্রহের মাধ্যমে সংগঠনটির কার্যক্রম নতুনভাবে বিকশিত হয়। লক্ষ্য ছিল—নারীদের মুখে হাসি ফোটানো এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলা।

এখানেই ছোট একটি উদ্যোগ ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৃহৎ সামাজিক উন্নয়ন কাঠামোয়।

টিএমএসএসের ইতিহাস অনুযায়ী, মূল সংগঠন ‘ঠেঙ্গামারা সবুজ সংঘ’ ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে এর দায়িত্ব ড. হোসনে-আরা বেগমের হাতে আসে এবং নারীদের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংগঠনটির নাম ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’—টিএমএসএস করা হয়।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামাজিক উদ্যোক্তা সংগঠন Ashoka-এর তথ্য অনুযায়ী, ড. হোসনে-আরা বেগম ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই স্থানীয়ভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৯১ সালে কলেজের চাকরি ছেড়ে টিএমএসএসের পূর্ণকালীন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ তাঁর প্রাথমিক সম্পৃক্ততা ও পূর্ণকালীন নেতৃত্বের সময়কাল আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন অধ্যায় থেকে জনসেবার অঙ্গীকার

ড. হোসনে-আরা বেগমের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭৫ সাল। পিকেএসএফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওই সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবন-মৃত্যুর কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তাঁর জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সেই সংকটময় সময়ে তিনি বেঁচে গেলে জীবনের বড় অংশ পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবায় উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। পরবর্তী কর্মজীবনে তিনি সেই অঙ্গীকারকেই নিজের কাজের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর নারী উন্নয়ন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করার দর্শনের সম্পর্ক রয়েছে বলেও Ashoka-এর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৮৯ সালে তিনি Ashoka Fellowship লাভ করেন; Ashoka তাঁর কাজকে দরিদ্র নারীদের নেতৃত্বে একটি তৃণমূল সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছে।

নারী উন্নয়ন থেকে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন

টিএমএসএসের শুরু থেকেই নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ক্ষুদ্রঋণ, সঞ্চয়, আয় বর্ধক কর্মকাণ্ড, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

ড. হোসনে-আরা বেগম পিকেএসএফকে বলেছেন, টিএমএসএসের প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই ধারাবাহিক কাজ পরবর্তীতে টিএমএসএসের ‘Health, Education & Microfinance’ বা HEM মডেলে রূপ নেয়। টিএমএসএসের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই এই মডেলের মূল লক্ষ্য।

উত্তরবঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ

ড. হোসনে-আরা বেগমের নেতৃত্বে টিএমএসএসের সবচেয়ে দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড গুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত।

১৯৯৫ সালে বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় রাফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। টিএমএসএসের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে তুলনা মূলক সাশ্রয়ী ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যেই হাসপাতালটির যাত্রা শুরু।

ছোট পরিসরের সেই হাসপাতাল পরবর্তীতে বড় স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় পরিণত হয়। টিএমএসএসের বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের তথ্য অনুযায়ী, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রাফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতাল মিলিয়ে ১,০০০ শয্যার স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম রয়েছে।

চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষা, নার্সিং, মেডিকেল টেকনোলজি, কমিউনিটি প্যারামেডিক ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রশিক্ষণ সহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রমও গড়ে উঠেছে।

মেডিকেল কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—শিক্ষায় বিস্তৃত পদচিহ্ন

স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষাকে টিএমএসএসের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে।

টিএমএসএসের নথিতে পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, টিএমএসএস নার্সিং কলেজ, মেডিকেল ইনস্টিটিউট, মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, কমিউনিটি প্যারামেডিক ইনস্টিটিউট, টিএমএসএস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা রয়েছে।

২০১৮ সালের একটি টিএমএসএস বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, তাদের ৩২টি সাধারণ, মেডিকেল ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। একই প্রতিবেদনে ২০১৫ সালে বগুড়ায় টিএমএসএস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার তথ্যও রয়েছে।

বর্তমান টিএমএসএসের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে মেডিকেল শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, নার্সিং, কারিগরি শিক্ষা, আইসিটি, কৃষি প্রযুক্তি, মেরিন শিক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষার বিভিন্ন স্তর রয়েছে।

বগুড়ার পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবেও ড. হোসনে-আরা বেগমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু শিক্ষা ও চিকিৎসা নয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উদ্যোগ

টিএমএসএসের বিস্তার কেবল এনজিও কার্যক্রম, হাসপাতাল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থেমে থাকেনি। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন নথিতে কৃষি, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, খাদ্য, সামাজিক ব্যবসা, শিল্প ও অন্যান্য উদ্যোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা-জীবনীতে পেপার মিল, টাইলস কারখানা, ইটভাটা, কাঠের বোর্ড, পানি প্রকল্প, কাচ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ সহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বগুড়ার পাঁচ তারকা হোটেল মম ইনও টিএমএসএসের উদ্যোগের অংশ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

২০২৪ সালে ড. হোসনে-আরা বেগম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। টিএমএসএসের প্রকাশিত তথ্যে তাঁকে মম ইন পার্ক অ্যান্ড রিসোর্টের চেয়ারম্যান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে ড. হোসনে-আরা বেগম বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

১৯৮৯ সালে তিনি Ashoka Fellowship লাভ করেন। Ashoka-এর নিজস্ব নথিতে তাঁর কাজকে দরিদ্র নারীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তৃণমূল সামাজিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

২০০৭ সালে তিনি বেগম রোকেয়া পদক লাভ করেন। সমকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, নারী শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম ও অধ্যাপিকা লতিফা আখন্দকে ২০০৭ সালের বেগম রোকেয়া পদক দেওয়া হয়।

টিএমএসএসের নিজস্ব জীবনীতে তাঁর ৩৫টি পুরস্কার ও বিভিন্ন জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে Ashoka Fellowship, Paul Harris Fellowship এবং AKS-এর মতো স্বীকৃতির উল্লেখ রয়েছে।

টিএমএসএসের সঙ্গে পিকেএসএফের দীর্ঘ পথচলা

টিএমএসএসের বিস্তারের ক্ষেত্রে পিকেএসএফের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

পিকেএসএফের তথ্য অনুযায়ী, টিএমএসএস ১৯৯১ সালে তাদের Partner Organization হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। পিকেএসএফের সাম্প্রতিক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ড. হোসনে-আরা বেগম প্রায় ৩৪ বছর ধরে টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

ড. হোসনে-আরা বেগম নিজেও সাক্ষাৎকারে পিকেএসএফের প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, কৌশলগত পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন।

বগুড়া থেকে সারা দেশে

টিএমএসএসের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ, মানবাধিকার, জলবায়ু, কর্মসংস্থান, কৃষি, প্রযুক্তি ও সামাজিক ব্যবসাসহ একাধিক খাতে বিস্তৃত।

টিএমএসএসের বর্তমান SDG-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যসেবায় ২৭ লাখের বেশি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর কথা জানিয়েছে এবং শিক্ষা খাতে ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছে। একই উৎসে দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে ৯৫ লাখের বেশি মানুষের সরাসরি উপকার পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। এসব সংখ্যা টিএমএসএসের নিজস্ব পরিসংখ্যান; স্বাধীনভাবে প্রতিটি সংখ্যার যাচাই এই প্রতিবেদনের আওতায় করা হয়নি।

উত্তরবঙ্গের জন্য তাঁর কাজের তাৎপর্য কোথায়?

ড. হোসনে-আরা বেগমের কর্মযাত্রার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কেবল একটি এনজিও পরিচালনা করেননি; বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানকে একই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন।

বগুড়ার ঠেঙ্গামারার দরিদ্র নারীদের ছোট উদ্যোগ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি ধীরে ধীরে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ এবং সামাজিক ব্যবসার বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক হলো—উত্তরবঙ্গের একটি অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উদ্যোগ পরবর্তীতে বৃহত্তর জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।

তাঁর কাজের মূল্যায়নে তাই শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নয়, একটি ধারণার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ—দারিদ্র্য বিমোচনকে কেবল ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা ও আয় সৃষ্টির সুযোগকে একসঙ্গে দেখার চেষ্টা।

শেষ কথা

এক মুঠো চাল দিয়ে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগ কতদূর যেতে পারে—ড. হোসনে-আরা বেগমের দীর্ঘ কর্মজীবন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

বগুড়ার ঠেঙ্গামারার দরিদ্র নারীদের ছোট সঞ্চয় থেকে শুরু করে আজকের টিএমএসএসের বিস্তৃত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড—এই দীর্ঘ পথচলায় যেমন রয়েছে ব্যক্তিগত সংগ্রাম, তেমনি রয়েছে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গল্প।

নারী উন্নয়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো উত্তরবঙ্গের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে একটি দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করেছে।

আর সেই কারণেই ড. হোসনে-আরা বেগমের গল্প শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্প নয়; এটি বগুড়ার মাটি থেকে উঠে আসা একটি দীর্ঘ সামাজিক উদ্যোগ কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে—তারও একটি বিস্তৃত ইতিহাস।

মন্তব্য করুন