প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬, ১২:১৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
সম্পদ অর্জনে কেউ পিছু হটতে চায় না। তা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে যে পর্যায়েরই হোক না কেন। এর সাথে রয়েছে ন্যায় অন্যায়ের সংশ্লিষ্টতা। এখান থেকেই শুরু হয় শান্তি অশান্তির বীজ বপন। বর্তমানে হরমুজ নিয়ে যে হুলস্থুল অবস্থা তার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন ও ব্যক্তি বিশেষের গোঁয়ার্তুমির যে মঞ্চায়ন চলছে, এতে করে বিশ্ববাসী এক কথায় অতিষ্ঠ। কোনো অঞ্চল বা দেশের তেল, গ্যাস, খনিজ বা পানির মত মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ অন্য কোনো দেশ কর্তৃক যদি অন্যায্য নিয়ন্ত্রণ/দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় তবে তা সরাসরি সহিংস সংঘাত বা যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। আর এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। কথায় আছে 'চোর না শুনে ধর্মের কাহিনী।' বিশ্ব মোড়লীপনায় মধ্যপ্রাচ্য তথা উপসাগরীয় অঞ্চলে যা মঞ্চস্থ হচ্ছে (যদিও এই অরাজকতা আগে থেকেই চলমান), এটা এক কথায় ডাকাতি, লুন্ঠন, দস্যুতার সীমা ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনে দশকের পর দশক গণহ*ত্যা চালিয়ে ওরা ক্ষান্ত হয়নি। এখন হরমুজ প্রনালী, খার্গ দ্বীপ ইরান নিয়ে মেতেছে; যা খুশী তাই করে যাচ্ছে। কোন ইস্যু তৈরির আগে তারা তো ধর্মকে আগেই ছুড়ে ফেলে দেয় অথবা নিজেদের মত করে ধর্ম তৈরি করে নেয়।
অতীতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গ্রীক বীর আলেকজান্ডার অতি অল্প বয়সে প্রায় অর্ধ পৃথিবী পদানত করেছিলেন। বেঁচেছিলেন মাত্র ৩৩ বছর। মৃত্যুর আগে তাঁর সেনাপতিদের ডেকে তিনি নিজের শেষ তিনটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন, যা মানুষের জীবনের নশ্বরতাকে স্পষ্ট করে তোলে। তিনি বলেছিলেন: (১) মৃত্যুর পর শুধু আমার চিকিৎসকরাই কফিন বহন করবে। (২) আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্থানে যাবে সেই পথে আমার সারা জীবনের অর্জিত সোনা-রূপা, মণি মাণিক্য রাস্তায় ছড়িয়ে দিবে। এবং (৩) কফিন বহনের সময় আমার দুই হাত কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখবে। এই তিনটি ইচ্ছার কারণ জানতে চাইলে আলেকজান্ডার তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যায় বলেন, প্রথমটি হলো- চিকিৎসা মৃত্যুর সমাধান নয়। চিকিৎসকরা ক্ষমতাধর হলেও মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। দ্বিতীয়টি- সারাজীবন সম্পদ আহরণ করলেও মৃত্যুর পর সাথে করে কিছুই নেওয়া যায় না। তৃতীয়টি- মানুষ খালি হাতে পৃথিবীতে আসে এবং খালি হাতেই বিদায় নেয়।
যাক সেসব তত্ত্বকথা, রাজনীতি, যুদ্ধনীতি আমার বুঝবার বিষয় নয়। বুঝার বিষয়টি এড়ানো যায়না যখন এসমস্ত উদ্ভুত পরিস্থিতির কারণে আমার জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় সেসবের পরিণতিতে। যখন যেখানেই এধরণের যথেচ্ছাচার ঘটানো হয়, এর প্রভাব তখন আর সেখানে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলাফল গ্লোবাল পরিবেশটাকেই তছনছ করে দেয়। বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রুটি রুজির পথ রুদ্ধ হয়, এমনকি মানুষকে দুর্ভিক্ষের কবলেও পড়তে হয়। তাই বলতে চাইছি ব্যক্তি যদি সৎ হয়, সেটা পরিবার প্রধান বা রাষ্ট্র প্রধান যে পর্যায়ের হোক - তাহলে সকল মানুষের জন্যই মঙ্গলের কারণ হতে পারে।
আমরা ব্যক্তি মানুষের কর্মকাণ্ড দিয়ে এর কিঞ্চিত অনুধাবনের চেষ্টা করতে পারি। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে ধনী ও দরিদ্রের বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, যার পেছনে তাঁর গভীর প্রজ্ঞা, রহমত এবং মানুষের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এই বৈচিত্র্য কেবল জীবনযাত্রার পার্থক্য নয়, বরং এর যে কোন অবস্থানে থেকেও মঙ্গল বা অমঙ্গলের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যায়।
এপ্রসঙ্গে চিত্তাকর্ষক একটি ঘটনা উল্লেখ করলে অবাক হতে হয়, আবার চাইলে শিক্ষাও গ্রহণ করা যায়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই হজরত ওসমান রাঃ একজন সম্পদশালী লোক ছিলেন। একবার তিনি প্রিয় নবীজিকে বললেন- হে আল্লাহর রাসূল, আপনি দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমার সম্পদ কমিয়ে দেন। কারণ আমি সবসময় আশংকায় থাকি আমার সম্পদের যথাযথ হিসাব দিতে পারবো কি-না? কিন্তু আল্লাহ তাকে সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর মিতব্যয়ীতার কারণে।
আরও অবাক করা বিষয় হলো, ১৪০০ বছর আগের হজরত ওসমান (রাঃ) এর ওয়াকফকৃত সম্পদ এখনও সৌদি আরবে সচল রয়েছে এবং মুসলমানদের উপকারে ব্যবহার হয়ে আসছে, যার কিছু নমুনা এখানে উল্লেখ করা হলো :-
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি: মদিনা পৌরসভায় আজও হজরত ওসমানের (রাঃ) নামে জমি ও সম্পত্তি নিবন্ধিত রয়েছে। সৌদি আরবের ওয়াকফ মন্ত্রণালয় বা সাধারণ ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ এখনো তাঁর নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে আসছে।
রুমাহ কূপ ও বাগান: ঐতিহাসিক 'বীরে রুমা' (Well of Ruma) বা রুমা কূপ এবং এর আশেপাশের খেজুর বাগান এখনও তাঁর ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়।
বিদ্যুৎ ও পানির বিল: অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এই বাগানের নামে আজও বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করা হয়।
হোটেল ও আয়: এই ওয়াকফ বাগানের খেজুর বিক্রি করে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ এতিম ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। বাকি অর্ধেক অর্থ হজরত ওসমানের (রাঃ) ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়। এই সঞ্চিত অর্থ দিয়ে মদিনায় একটি বড় হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে।
বর্তমান আয়: ধারণা করা হয়, এই ওয়াকফ থেকে বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল আয় হয়ে থাকে। তাঁর এই অসামান্য সাদাকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে তিনি আজও মুসলিম উম্মাহর সেবায় অবদান রেখে চলেছেন।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, ধনী-দরিদ্রের এই পার্থক্য মানুষের মধ্যে সহানুভূতি, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, যা পার্থিব ও পরকালীন কল্যাণের কারণ। এপ্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের উল্লেখযোগ্য একটি আয়াত বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
"যদি আল্লাহ তাঁর (সব) বান্দাদের রিযিকে প্রাচুর্য দিতেন তাহলে তারা নিঃসন্দেহে যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করতো, তিনি বরং পরিমাণমত যাকে যতটুকু চান তার জন্য ততটুকু রিযিকই নাজিল করেন; অবশ্য তিনি নিজ বান্দাদের প্রয়োজন সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল আছেন, তিনি তাদের প্রয়োজনের দিকেও নজর রাখেন।" (৪২:২৭)।
অর্থাৎ যার যে পরিমাণ সমৃদ্ধি সহ্য করার শক্তি আছে তাকে তিনি সেই পরিমাণই সমৃদ্ধি দান করেন। তিনি এ বিষয়ে অবগত আছেন, কে কত পরিমাণ প্রাচুর্য পাওয়ার হকদার। তাই যে লোক দরিদ্রতার উপযুক্ত তাকে তিনি দারিদ্রতা দান করেন এবং যে প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির উপযুক্ত তাকে প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি দান করেন। আল্লাহ বলেন আমার বান্দাদের মধ্যে কতক এমন আছে যে প্রাচুর্য পাওয়ার উপযুক্ত তাকে তাই দান করি। যদি তাকে দরিদ্র করা হতো তবে সে দ্বীন হারিয়ে ফেলতো। আর কতক এমন আছে যে দরিদ্রতার উপযুক্ত তাকে দরিদ্রতা দান করেছি। যদি সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য দান করা হতো তবে সে ভোগ বিলাসে গা ভাসিয়ে দ্বীন হারিয়ে ফেলতো।
আয়াতের মূল শিক্ষা তালাশ করলে এর যথার্থতা স্পষ্ট হয়, যেমন:
পরিমিত রিযিক: মানুষের অবাধ্যতা ও অহংকার রোধ করতে আল্লাহ মানুষের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী মেপে রিযিক দেন।
বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা: প্রচুর সম্পদ থাকলে মানুষ সীমা লঙ্ঘন করত এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। বাস্তব জীবনে এর প্রচুর উদাহরণ বর্তমান।
আল্লাহর জ্ঞান: তিনি ভালো করেই জানেন কার জন্য কতটুকু রিযিক প্রয়োজন। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নিজের জ্ঞান এবং বান্দার প্রতি করুণার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
এছাড়াও ধনী-দরিদ্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও কল্যাণসমূহ সম্পর্কে নিচের কতিপয় পর্যবেক্ষণে ব্যক্তি মানুষের ধারণা সুস্পষ্ট হবে বলে আশা করা যায়।
পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতা ও সমাজ ব্যবস্থা:
আল্লাহ ধনীদের সম্পদ দিয়েছেন এবং অন্যদের মেধা বা কাজের সুযোগ দিয়েছেন। কেউ কখনো নিজের ওপর পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; ধনীর সম্পদের প্রয়োজন, আবার শ্রমিকের শ্রমের প্রয়োজন। এই পারস্পরিক মুখাপেক্ষিতা বিশ্ব ব্যবস্থাকে সচল রেখেছে।
ধৈর্য ও পরীক্ষা: ধনী মানুষকে তার সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করা হয় যে সে তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে কি না বা কৃতজ্ঞ থাকে কি না। দরিদ্র মানুষকে অভাব ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়।
দান ও ভ্রাতৃত্ব: ধনীদের সম্পদে দরিদ্রের নির্দিষ্ট অধিকার বা হক রয়েছে। ধনীরা দান-সদকার মাধ্যমে দরিদ্রের সহায়তা করে, যা সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও প্রেম বাড়ায় এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে।
আল্লাহমুখী হওয়া: পার্থিব অভাব-অনটন অনেক সময় মানুষকে জাগতিক মোহের বদলে স্রষ্টামুখী হতে সাহায্য করে, যার ফলে দরিদ্র মানুষ পরকালের জন্য অধিক প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়।
আল্লাহর কাছে মর্যাদার ভিত্তি ধন-সম্পদ নয়, আবার ধন-সম্পদ ঐশ্বরিক সুরক্ষার কারণও নয়, বরং তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহর ভয়। দরিদ্র ব্যক্তি যদি ধৈর্যধারণ করে, তবে সে ধনীদের চেয়েও বেশি মর্যাদা পেতে পারে। পক্ষন্তরে ধনী ব্যক্তি যদি তার সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তার জন্য সেটাই আশীর্বাদের পরিবর্তে অভিশাপের কারণ হয়ে যায়।
লেখক: এভিপি (অব.) ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি।
মন্তব্য করুন