প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবার, ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

কর্মক্ষেত্রে ক্লান্ত, শ্রান্ত কর্মফল সাফল্য বা কৌশল হতে পারে না

কাজী মমরেজ মাহমুদ

​গত ২০ বছর ধরে দেশের কর্পোরেট জগতের ভেতরে থেকে খুব কাছ থেকে একটা জিনিস দেখে আসছি—আমাদের এখানে কর্ম ঘন্টার বাহিরে গিয়ে রাত জেগে কাজ করা বা সবসময় চরম মানসিক চাপে থাকাকে খুব বাহবা দেওয়া হয়। একে দেখা হয় ‘কাজের প্রতি তীব্র নিষ্ঠা’ বা ‘ডেডিকেশন’ হিসেবে। কিন্তু একজন প্রধান নির্বাহী বা এইচআর লিডার হিসেবে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা আর আন্তর্জাতিক গবেষণা দুটোই ভিন্ন কথা বলে। অনবরত অতিরিক্ত কাজের চাপ মানুষের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়, কাজের আনন্দ নষ্ট করে এবং দিনশেষে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ক্ষতিই ডেকে আনে।

অতিরিক্ত কাজ ও ক্লান্তিকে বাহবা দেওয়ার সংস্কৃতি 
​আমাদের দেশের অফিসে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত বসে থাকা, কিংবা ছুটির দিনেও হোয়াটসঅ্যাপে সাথে সাথে রেসপন্স করাকে বড় করে দেখা হয়। অথচ এই অভ্যাসটি যখন পুরো টিমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কর্মীদের ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়। আমাদের আসলে দরকার ‘স্মার্ট ওয়ার্ক’, অন্ধের মতো ‘হার্ড ওয়ার্ক’ নয়। কথায় বলে —Handsome is that handsome does, অর্থাৎ মুখের কথায় নয়, কাজের সুন্দর ফলেই তো আসল যোগ্যতা প্রকাশ পায়!
​ঢাকার গুলশান বা মতিঝিলের অফিস পাড়ার লিফটে কিংবা আশপাশের চায়ের টং দোকানে এমন দৃশ্য অহরহ চোখে পড়ে:
​এক সহকর্মী ক্লান্ত চোখ নিয়ে বলছেন, “ভাই, কাল রাতের ক্লায়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানাতে বানাতে ভোর ৪টা বেজে গেছে। ঘুমানোর সময় পাইনি, সোজা গোসল করে অফিসে চলে আসছি!”
​আর সাথে সাথেই অন্যজন বলে উঠছেন, “অসাধারণ ভাই! আপনি তো সত্যি অসাধারণ কাজের মানুষ (রিয়েল বস)!”
​আমরা আজকের দিনেও শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিকেই সবচেয়ে বড় গুণ বলে ধরে নিচ্ছি। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে খাটুনির এই ঝোঁকটা অনেকের কাছে নিজেকে জাহির করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরিণতি কী হচ্ছে? কর্মী তার ভেতরের স্বাভাবিক কাজের ক্ষমতা ও নতুন কিছু চিন্তা করার সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলছে।

​ক্লান্তি কি ভালো চিন্তা আনতে পারে? 
​চোখে ঘুম থাকলে বা শরীর আর মন ক্লান্ত থাকলে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব। এর ফলে অফিসে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব, কাজে ঢিলেমি আর ভুল সিদ্ধান্তের জন্ম হয়। ​আমার নিজের চোখে দেখা একটি ঘটনা বলি। ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের একজন সিনিয়র ডিরেক্টর খুব গর্ব করে একদিন আমাকে বলছিলেন যে, তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। কিন্তু সপ্তাহ শেষে কী হলো? তিনি টিমের ছোট ছোট কর্মীদের ওপর মেজাজ হারালেন, ক্লায়েন্টের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা চাহিদা ভুল বুঝলেন, আর সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবারও তাকে অফিসে গিয়ে আগের ভুল সিদ্ধান্তগুলো শুধরাতে বসে থাকতে হলো।
​অন্যদিকে, ঠিক একই টিমের এক জুনিয়র এক্সিকিউটিভ সন্ধ্যা ৬টা বাজলেই গুছিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যেতেন। বাসায় গিয়ে পরিবারকে সময় দিতেন, ভালোভাবে ঘুমাতেন এবং পরদিন একদম ফ্রেশ মাথায় অফিসে আসতেন। সেই সপ্তাহের বৃহস্পতিবার যখন পুরো লিডারশিপ টিম একটা ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি নিয়ে টানা দুই সপ্তাহ ধরে কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, তখন এই জুনিয়র কর্মীটি মাত্র আধঘণ্টায় এমন চমৎকার এক সমাধান বের করে দিলেন যে সবাই অবাক হয়ে গেল!
​আজকাল কাল্পনিক লক্ষ্য পূরণের দৌড়ে গিয়ে আমাদের তরুণ পেশাজীবীরা নীরবে বিষণ্নতা ও ‘বার্নআউট’-এর শিকার হচ্ছেন।

​নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা সচেতনতার মুহূর্ত 
​গত দুই দশকে আমাদের দেশের বড় বড় কর্পোরেট হাবগুলোতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি—বাইরে থেকে যে মানুষটাকে ভীষণ সফল মনে হয়, তার পেছনের গল্পটা কিন্তু দিনের পর দিন ১২-১৪ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম আর এলোমেলো জীবনের। অনেকে বিশ্বাস করেন, ক্যারিয়ারে ওপরে উঠতে হলে শরীর আর মনকে শেষ করতে হবে।
​কিন্তু এ ধারণা একদম ভুল। ক্লান্তির এই চাকা থেকে বের হতে হলে কাজের ধরণে আর জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। রাত জেগে সময় নষ্ট না করে সঠিক সময়ে বিশ্রাম আর ঘুম দিলে দিনের বেলা কাজের মান শতগুণ বেড়ে যায়। ২৪ ঘণ্টা মোবাইলে বা ইমেইলে ব্যস্ত থাকা কাজের যোগ্যতা নয়, বরং নির্ধারিত সময়ে শান্ত মাথায় কাজ শেষ করাই হলো আসল দক্ষতা।

আমাদের কর্পোরেট সমাজের জন্য বার্তা 
​আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক চাকরিজীবী আজ অনিদ্রা আর মানসিক চাপে ভুগছেন। ঘুমের অভাব আর শারীরিক অবসাদের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে কোম্পানি তথা দেশের অর্থনীতিকে।​একটি সুষ্ঠু ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মচারীদের লক্ষ্য ছোট করা সমাধান নয়; সমাধান হলো এমন একটি কাজের পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন কর্মী বছরের পর বছর সুস্থ ও সতেজ থেকে নিজের সেরাটা দিতে পারেন।

ভবিষ্যতের মানবিক ও সফল কাজের পরিবেশ 
​ভবিষ্যতে সেইসব প্রতিষ্ঠানই বাজারে টিকে থাকবে এবং সফল হবে, যারা কর্মীদের রক্ত পানি করা ১০-১২ ঘণ্টার খাটুনি আদায় করে না। বরং তারাই সফল হবে, যারা কর্মীদের এমন একটা কাজের ক্ষেত্র উপহার দিতে পারবে যেখানে: 
​১. সুস্থ ও সতেজ মাথায় চিন্তা করার সুযোগ থাকবে,
​২. কাজের বাইরে নিজের পরিবার ও জীবনের জন্য উপযুক্ত সময় পাওয়া যাবে, এবং ​৩. দীর্ঘমেয়াদে হাসিমুখে প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো কিছু করার পরিবেশ থাকবে।
​ক্লান্তি বা মানসিক চাপ দিয়ে কোনোদিন দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য আসে না। প্রকৃত পারফর্ম্যান্স আসে গভীর চিন্তা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকে। আর তা কেবল তখনই সম্ভব, যখন কর্মীরা অফিসে কোনোমতে টিকে থাকার লড়াই না করে, মানুষ হিসেবে সম্মানের সাথে কাজ করার সুযোগ পাবেন। তাই এখনই সিময় কর্মক্ষেত্রে শটগিক শৃঙ্খলা মেনে ছিলের সংস্কৃতি তৈরি করা যা শুরু করবেন উচ্চ আসন ধারী কর্মকর্তা ও বিজনেস লিডাররা। 
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও কর্পোরেট নির্বাহী।

মন্তব্য করুন