প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১২:৪৮ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

কনসার্টের অর্থ নিয়ে উত্তেজনা

ইতালিতে নগর বাউল জেমস ও ম্যানেজার রবিনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

নগর বাউল জেমস ও অভিযুক্ত ম্যানেজার রবিন


ইতালি রোম থেকে ডাবলু চৌধুরী
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল জেমসের ইতালি সফর ও কনসার্ট আয়োজনকে ঘিরে তার ম্যানেজার রবিনের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থের হিসাব না দেওয়া এবং কনসার্টের টিকিট বিক্রির অর্থ নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান হোসাইন আহমেদ মোয়াজ। অভিযোগের পর রোমের একটি হোটেলে ইতালিয়ান পুলিশ এসে বিষয়টি শুনেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।

হোসাইন আহমেদ মোয়াজের দাবি, জেমসের ম্যানেজার রবিন তাকে ফোন করে ইতালিতে জেমসের কনসার্ট আয়োজনের প্রস্তাব দেন। মোয়াজ জানান, জেমসের কনসার্ট আয়োজনের মতো পর্যাপ্ত অর্থ তার কাছে নেই জানালে রবিন তাকে আশ্বস্ত করেন—তিনি আয়োজন শুরু করতে পারেন, পরবর্তী অর্থের বিষয়টি রবিন নিজেই দেখবেন।

এরপর রোমের পাশাপাশি ভেনিসেও কনসার্ট আয়োজনের উদ্যোগ নেন মোয়াজ। তার দাবি, ইতালির প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভেন্যুগুলোতে অগ্রিম অর্থ দিয়ে চুক্তি করে তারিখ বুক করা হয়। জেমসের ম্যানেজার রবিনের সঙ্গেও ৫ হাজার ইউরো অগ্রিম দেওয়ার বিষয়ে চুক্তি হয় বলে জানান তিনি। রোমে ১৬ আগস্ট এবং ভেনিসে ২২ আগস্ট কনসার্টের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

মোয়াজের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর টেলিভিশন, প্রিন্ট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। পাশাপাশি রোম ও ভেনিসের কনসার্টের টিকিট বিক্রিও শুরু করেন তিনি।

তবে রোমের কনসার্টের প্রায় এক সপ্তাহ আগে পরিস্থিতি বদলে যায় বলে অভিযোগ করেন মোয়াজ। তার দাবি, রবিন তাকে ভেনিসের অনুষ্ঠান ছেড়ে দিতে বলেন। অন্য একটি পক্ষের সঙ্গে বেশি অর্থের বিনিময়ে যোগাযোগ করে ভেনিসের অনুষ্ঠান তাদের দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মোয়াজ বলেন, এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে রোমের অনুষ্ঠানও বাতিল করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। দুইটি ভেন্যুর জন্য তার বিপুল অর্থ আটকে যাওয়ায় তিনি চাপে পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত রবিনের কথামতো ভেনিসের অনুষ্ঠান অন্য পক্ষকে ছেড়ে দেন বলে জানান তিনি। তবে ইতোমধ্যে বিক্রি হওয়া টিকিটের অর্থ আয়োজক কমিটিকে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন মোয়াজ।

কনসার্টের দিন টিকিটের অর্থ নিয়ে বিরোধ

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি রোমের ১৬ আগস্টের কনসার্টকে ঘিরে। মোয়াজের দাবি, কনসার্টের দিন জেমসের ম্যানেজার রবিন নিজে টিকিট কাউন্টারে বসে টিকিট বিক্রির অর্থ নিয়ে নেন।

এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে বলা হয়, তিনি বিষয়টি নিয়ে বেশি কথা বললে জেমসকে মঞ্চে উঠতে দেওয়া হবে না। ফলে একপ্রকার চাপের মুখে তিনি পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ করেন মোয়াজ।

কনসার্ট শেষ হওয়ার পর ১৮ আগস্ট ম্যানেজারের কাছে আয়-ব্যয়ের হিসাব চাইলে তিনি হিসাব দিতে অস্বীকৃতি জানান বলেও দাবি করেন আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান।

পুলিশের দ্বারস্থ আয়োজক

এরপর বিষয়টি নিয়ে ইতালিয়ান পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মোয়াজ। তার দাবি, পুলিশ হোটেলে এসে তার বক্তব্য ও অভিযোগ শোনে এবং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দেয়।

মোয়াজের দাবি, পরদিন সকালে হোটেলে গিয়ে তিনি দেখতে পান—জেমস, তার ম্যানেজারসহ পুরো টিম কাউকে কিছু না জানিয়েই হোটেল ছেড়ে চলে গেছে।

এ সময় তিনি পুলিশের কাছে আরও একটি অভিযোগ তুলে ধরেন। তার দাবি, কনসার্টের অর্থের একটি অংশ অবৈধ পথে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে এবং এর পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জেমসের সঙ্গে কথা বলার দাবিও আয়োজকের

মোয়াজের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি জেমসের সঙ্গে কথা বলতে গেলে জেমস তাকে জানান, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং ম্যানেজার রবিনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

তবে জেমসের ওই সময়ের শারীরিক বা মানসিক অবস্থার বিষয়ে মোয়াজের করা মন্তব্যের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এ অংশটিও অভিযোগকারীর বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

তদন্তেই বের হবে প্রকৃত ঘটনা

এ ঘটনায় জেমসের ম্যানেজার রবিনের বক্তব্য এখনো জানা যায়নি। একইভাবে জেমসের পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আয়োজকের করা প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, হিসাব না দেওয়া এবং অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশি তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত এলে তবেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

জেমসের ইতালি সফরের এই কনসার্টকে ঘিরে আয়োজক ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিরোধ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা মুখরোচক আলোচনা।

কনসার্ট-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে দাবি ওঠে, জেমসের দল হোটেল ছেড়ে চলে গেছে এবং আয়োজকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। 
এ বিষয়ে জেমসের মুখপাত্র ও ম্যানেজার রুবাইয়াত ঠাকুর রবিন দাবি করেন, আয়োজকদের আর্থিক প্রত্যাশা পূরণ না হলেই শিল্পীকে দোষারোপ করার প্রবণতা নতুন নয়। তার ভাষায়,"শো না জমলে, হাউসফুল না হলে কিংবা আয়োজকরা প্রত্যাশিত লাভ করতে না পারলে তার দায় আমাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি দুঃখজনক।"
রবিনের এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয়, কনসার্ট-পরবর্তী বিরোধের পেছনে আর্থিক ও আয়োজন-সংক্রান্ত মতপার্থক্য থাকতে পারে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে রোম পুলিশের কাছেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা শোনা গেছে।

এদিকে ইউরোপ সফর এখনও শেষ হয়নি। রোমের পর জেমসের পরবর্তী নির্ধারিত গন্তব্য ইতালির ঐতিহাসিক শহর ভেনিস, যেখানে তার আরেকটি কনসার্ট হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর সফরের শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা সুইডেনে।

রোমের ঘটনাকে ঘিরে নানা আলোচনা থাকলেও এখন সবার নজর ভেনিসের কনসার্টের দিকে। সেখানে নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় কি না এবং রোমের বিতর্ক নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কী ব্যাখ্যা দেয়—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

মন্তব্য করুন