প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ১০:৫৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও চামড়া শিল্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুল্ক সুবিধা কতদিন থাকবে, তা নয়। বরং এই সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই শিল্প দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য কতটা প্রস্তুত হতে পারবে? কিন্তু সেই সুবিধা কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান দুই খাতকে।
পোশাকে এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে; আর বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চামড়া খাত আটকে আছে এক বিলিয়ন ডলারের আশপাশে। এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে এখনই উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবেশগত মান নিশ্চিত করতে না পারলে শুল্ক সুবিধা শেষ হওয়ার পর বড় ধাক্কা সামলাতে হবে বাংলাদেশকে।
শুল্ক সুবিধা থাকা অবস্থাতেই রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে ভিয়েতনামসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কের বাড়তি চাপ সামলাতে হলে এখনই উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অর্থায়ন ও পরিবেশগত মানের দুর্বলতা কাটাতে হবে।
অন্যদিকে, চামড়া শিল্পও এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় লাফ দিতে পারেনি। এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়লে ইউরোপের বাজারে সুবিধা ধরে রাখার সময় কিছুটা বাড়বে ঠিকই, কিন্তু তাতে মূল সমস্যা মিটবে না। কম শ্রম ব্যয়ের পুরোনো সুবিধা দিয়ে আগামী দিনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন। তাই বাড়তি সময়কে স্বস্তি নয়, পোশাক ও চামড়া শিল্পের আমূল সংস্কারের শেষ সুযোগ হিসাবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি। তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও খাতভিত্তিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল কোনো বিলম্বের জন্য নয়, বরং টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য কাজে লাগাতে হবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাত ও ব্যবহার করে রপ্তানি করা গেলে এ খাত থেকে বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করা সম্ভব। তবে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও স্থানান্তর প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল না।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এখনই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। তার মতে, গ্যাস সংকটের সমাধান, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা, কম খরচে অর্থায়ন এবং উন্নত সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর সম্ভাবনাকে আবারও দীর্ঘ স্বস্তির সময় হিসেবে দেখা। বাস্তবতা হলো, শুল্ক সুবিধা এখনো থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় দ্রুত কমছে। চামড়া খাতেও এক দশকের বেশি সময় ধরে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে সম্ভাবনাও কম নয়।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ শ্রমিক, দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক ক্রেতা সম্পর্ক এবং চামড়া শিল্পের স্থানীয় কাঁচামাল- সবই বড় সম্পদ। এখন এসব সম্পদকে আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত মান ও উচ্চমূল্যের পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাই তাই মূল প্রশ্ন হলো, সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ এমন একটি শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারবে কি না, যেখানে কম শুল্কের পাশাপাশি পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা, দ্রুত সরবরাহ, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত মান হবে প্রধান প্রতিযোগিতার শক্তি।
সাকিফ শামীম আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া বাড়তি সময় কাজে লাগানো গেলে শুল্ক সুবিধা কমলেও রপ্তানি বাড়তে পারে। আর সময়টি কেবল পার হয়ে গেলে ২০৩২-এর পর শুল্কের ধাক্কা, উৎপাদন ব্যয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা একসঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সামনে পথ দুটি, সুবিধার ওপর নির্ভরতা, অথবা সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আমরা কোন পথটি বেছে নিই।
এ প্রসঙ্গে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ ছাড়া বড় বৈশ্বিক ক্রেতাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন। সাভারের বর্জ্য শোধনাগার ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশের চামড়া উন্নত বাজারে কার্যত অদৃশ্যই থেকে যাবে। তিনি আরও মনে করেন, যথাযথ নীতিসহায়তা, অবকাঠামো ও পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব। তার মতে, চামড়া খাতের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো মূল্যসংযোজন। শুধু প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি না করে জুতা, ব্যাগ, মানিব্যাগ, ভ্রমণসামগ্রী, গাড়ির আসনের চামড়া ও অন্যান্য তৈরি পণ্যে যেতে পারলে আয় বহুগুণ বাড়তে পারে।
মন্তব্য করুন