প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৪:১২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

এক মায়ের ত্যাগ, এক পরিবারের স্বপ্ন আর এক তরুণের সাফল্যের গল্প

গোল্ডেন জিপিএ-৫ থেকে জাপানের মেক্সট স্কলারশিপ, মায়ের দোয়া মাথায় নিয়ে জাপানের পথে সৃজন

বিশেষ প্রতিবেদন

রাত তখন ২টা ২৫ মিনিট। চারপাশে নীরবতা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদায়ের ব্যস্ততা। বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে চড়ে অজানা এক নতুন অধ্যায়ের পথে যাত্রা করলেন এস এম শাহরিয়ার আহমেদ সৃজন। গন্তব্য জাপান। লক্ষ্য উচ্চতর শিক্ষা। সঙ্গে শুধু প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নয়—সঙ্গে রয়েছে বাবা-মায়ের দোয়া, পরিবারের ভালোবাসা আর দেশের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার।

জাপানের University of Toyama-তে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য শতভাগ অর্থায়িত MEXT Scholarship (Full Fund) অর্জন করেছেন সৃজন। তাঁর এই অর্জন নিছক একটি বৃত্তি পাওয়া নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা, পরিবারের ত্যাগ, মায়ের দোয়া এবং একজন সন্তানের স্বপ্ন পূরণের নিরলস সাধনা।

সৃজনের শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা। ২০১৪ সালে এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫। ২০১৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে স্নাতক এবং ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। এবার সেই পথই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে জাপানের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে।

কিন্তু একটি সাফল্যের গল্পের আড়ালে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি আলো ছড়ায়, সেটি হলো—একজন মায়ের গল্প।

‘আম্মু’ ডাকের অপেক্ষায় থাকতেন মা

সৃজনের মা শাহানাজ আক্তার। সন্তানের শিক্ষার পাশাপাশি তিনি তাঁকে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। সন্তান ঘর থেকে বের হলে মায়ের দোয়া ছাড়া যেন পথ চলা শুরু হতো না।

পরিবারের স্মৃতিতে আজও অমলিন সেই দৃশ্য—সৃজন বাইরে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়েছেন, আর মা ঘর থেকে ডাকছেন, ‘আম্মু’ বলে সাড়া না দেওয়া পর্যন্ত যেন তাঁর মন শান্ত হয় না। দোয়া পড়ে, মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে তারপরই বাইরে বের হতেন সৃজন।

মায়ের সেই মমতা হয়তো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে লেখা থাকে না। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় সেই শিক্ষাই মানুষকে শক্তি দেয়।

আর আশ্চর্যের বিষয়, বয়স বাড়লেও জ্ঞানার্জনের প্রতি মায়ের আগ্রহ কমেনি। এখনও তিনি মহিলা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন। সন্তানকে শিক্ষিত করার পাশাপাশি নিজেও শিক্ষার পথে থাকার এই মানসিকতা যেন সৃজনের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণাগুলোর একটি।

মায়ের ত্যাগ, সন্তানের সাফল্য

সন্তানের সাফল্যের জন্য একজন মা কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন—সৃজনের পরিবার তারও এক আবেগঘন উদাহরণ।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৃজনের জন্য তাঁর মা অনেক সময় নিজের খাওয়া-দাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই ছিল তাঁর চিন্তা। সন্তানের মুখে হাসি দেখাই যেন ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় সন্তানের জন্য মায়ের দোয়ার যে মর্যাদা, সৃজনের জীবন যেন তারই একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি।

এক মুঠো ভাতের ভালোবাসা

সৃজন ও তাঁর ছোট বোনের সম্পর্কও ভীষণ আবেগের।

পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, সৃজন যতই ভাত খান না কেন, ছোট বোনের হাতের একমুঠো ভাত না খেলে যেন তাঁর পেটই ভরত না।

এক মুঠো ভাত—শুনতে খুব ছোট একটি বিষয়। কিন্তু ভাই-বোনের ভালোবাসার কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল এক বিশাল বন্ধন।

আজ সেই ভাই হাজার হাজার মাইল দূরে জাপানের পথে। কিন্তু ছোটবেলার সেই একমুঠো ভাতের স্মৃতি নিশ্চয়ই তাঁর হৃদয়ের খুব কাছেই থাকবে।

বাবা গণমাধ্যমকর্মী, সন্তান বিশ্বমঞ্চের পথে

সৃজনের বাবা এস এম শাহ্ জালাল সাইফুল একজন গণমাধ্যমকর্মী। দাউদকান্দির জুয়ানপুর থেকে শুরু করে পরিবারের শিক্ষা ও মূল্যবোধের পরিবেশে বেড়ে ওঠা সৃজন আজ আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার পথে।

একজন গণমাধ্যমকর্মী বাবার জন্য সন্তানের এমন অর্জন নিঃসন্দেহে আনন্দ ও গর্বের। কলম দিয়ে সমাজের কথা বলা বাবার সন্তান আজ জ্ঞান অর্জনের জন্য দেশের সীমানা পেরিয়ে যাচ্ছেন—এ যেন একই পরিবারের দুই প্রজন্মের দুটি আলাদা পথ, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—আলো ছড়ানো।

সৃজনের একমাত্র বোন সানজিদা আক্তার সামিরা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। স্ত্রী ইসরাত জাহান লিয়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে যুক্ত রয়েছেন।

অর্থাৎ পরিবারটির প্রতিটি প্রজন্মের গল্পেই শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও পারিবারিক শিকড়

সৃজনের বড় জ্যাঠা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) হাজী মো. নজরুল ইসলাম সরকার। পরিবারের শিকড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের স্মৃতি।

পূর্ব শেখদী, যাত্রাবাড়ীর বড় খালা মমতাজ বেগমের কাছেও ছোটবেলা থেকে সৃজন পেয়েছেন স্নেহ ও আশ্রয়। ছোট খালা তাসলিমা বেগমের কোনো ছেলে সন্তান না থাকলেও সৃজনকে আপন ছেলের মতোই ভালোবাসেন। মামা ও খালাদের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই তরুণের জাপানযাত্রায় তাই আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে আবেগের দীর্ঘ ছায়া।

একজন শিক্ষিত মা, একটি শিক্ষিত পরিবার

একটি সন্তান যখন উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন বিমানবন্দরের বিদায় মুহূর্তে শুধু একটি পরিবার নয়—একটি মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্নও যেন আকাশে উড়ে যায়।

সৃজনের গল্পটি তাই শুধু মেধার গল্প নয়। এটি একজন মায়ের দোয়ার গল্প। একজন বাবার প্রেরণার গল্প। পরিবারের ভালোবাসার গল্প। আর সবচেয়ে বড় কথা—শিক্ষাকে জীবনের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করার গল্প।

প্রবাদে বলা হয়, ‘একজন শিক্ষিত মা একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে পারেন।’ সৃজনের জীবনের দিকে তাকালে কথাটির গভীরতা নতুন করে উপলব্ধি করা যায়।

মায়ের হাতে পাওয়া শিক্ষা, বাবার কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ এবং নিজের অধ্যবসায়কে পুঁজি করে সৃজন আজ জাপানের পথে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ফিরে এসে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন—এটাই পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা।

আজ তিনি বিমানে। পেছনে পড়ে রইল বাবা-মায়ের ঘর, ছোট বোনের একমুঠো ভাতের স্মৃতি, খালা-মামাদের স্নেহ, স্ত্রী ও পরিবারের ভালোবাসা।

সামনে নতুন দেশ, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন স্বপ্ন।

আর মাথার ওপর—একজন মায়ের দোয়া।

আল্লাহ তায়ালা সৃজনের এই জ্ঞানার্জনের সফর কবুল করুন, তাঁকে নিরাপদে রাখুন, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করুন এবং অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন।

মায়ের দোয়া আর সন্তানের মেধা—এই দুইয়ের মিলনেই হয়তো জন্ম নেয় এমন কিছু গল্প, যা শুধু একটি পরিবারের নয়; অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের।

মন্তব্য করুন