প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:২৩ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকা মালিক-শমিক ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

স্টাফ রিপোর্টার 
ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা মালিক-শ্রমিকের পক্ষ থেকে সরকারের নিকট ১০ দফা দাবি উত্থাপন করে জাতীয় প্রেসক্লাব আব্দুস সালাম হলে ( ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রবিবার সকাল ১১ টায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। 
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন ঢাকা মহানগর ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা মালিক-  শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি মাওলানা এস এম আবু বকর। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি  মোঃ সাইদুল মোল্লা এবং অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নুরুল ইসলাম। এছাড়াও সংগঠনের আরো অনেক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 
তারা তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেন -
ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা চালক ও মালিকদের জীবিকা, নিরাপদ সড়ক চলাচল, যানবাহনের আধুনিকায়ন এবং একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে "ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ" সরকারের নিকট ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সাকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ বা উচ্ছেদ করার পরিবর্তে আধুনিকায়ন, নিবন্ধন, ফিটনেস সার্টিফিকেশন, চালকদের প্রশিক্ষণ, বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, নির্ধারিত রুট এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সংগঠনটি মনে করে, একদিকে যাত্রী ও অন্যান্য সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত চালক, মালিক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ও ন্যায্য অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
এই লক্ষ্যেই সরকারের নিকট নিম্নোক্ত ১০ দফা দাবি পেশ করা হলো:
ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা মালিক-শ্রমিকের পক্ষ থেকে সরকারের নিকট দাবি সমুহ: 
দাবি নং-১. বুয়েটের ডিজাইন অনুযায়ী রিকশার আধুনিকায়ন ও ফিটনেস সার্টিফিকেশন:
বর্তমানে অটোরিকশা বন্ধের মূল কারণ এর ব্রেকিং সিস্টেম ও অনিরাপদ বডি স্ট্রাকচার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর অনুমোদিত আধুনিক ব্রেকিং ও নিরাপদ ডিজাইনের ই-রিকশা আমদানি নয় বরং দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারকে নির্দিষ্ট উৎপাদন কর দিয়ে বা স্থানীয়ভাবে তৈরি করা যা দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর চূড়ান্ত সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে সড়কে চলার অনুমতি দেয়া হোক। পূর্বের গাড়িগুলো পরিবর্তন বা রূপান্তর করার নির্দিষ্ট সময়সীমা (৩/৫ বছর) দেওয়া হোক,
দাবি নং- ২. বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও জোনভিত্তিক রুট পারমিট:
অটোরিকশাকে পুরোপুরি অবৈধ না রেখে সিটি কর্পোরেশন বা বিআরটিএ (BRTA) এর মাধ্যমে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন ভিত্তিক লাইসেন্স ও রুট পারমিট দেওয়া হোক। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং চালকরাও আত্মসম্মানের সাথে ও আইনি ঝামেলা ছাড়া জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। গাড়ি গুলোর জন্য নিবন্ধন ফি নির্ধারন করা হোক।
দাবি নং- ৩. চালকদের জন্য ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও বিশেষ ড্রাইভিং লাইসেন্স: দুর্ঘটনা কমানোর জন্য অটোরিকশা চালকদের জন্য বিআরটিএ/সিটি কর্পোরেশন-এর অধীনে ট্রাফিক নিয়মাবলী প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং সফলভাবে কোর্স সম্পন্নকারীদের জন্যই কেবল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্মার্ট কার্ড ইস্যু করা হোক।
দাবি নং- ৪. প্রতিটি গ্যারেজে (D3 category) বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করন প্রসঙ্গে।
প্রতিটি গ্যারেজে বিদ্যুৎ লাইনে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে (D3 category) চার্জিং স্টেশন চালুর করা হোক। স্মার্ট প্রিপেইড মিটারিং এবং বিদ্যুৎ অপচয় এবং অপসংযোগ রোধে অটোরিকশার গ্যারেজগুলোতে ডেসকো/ডিপিডিসি-এর মাধ্যমে (D3 category) রেটে 'স্মার্ট প্রিপেইড মিটার' দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হোক।
দাবি নং-৫: গ্যারেজ গুলো থেকে সরকারের বিদ্যুৎ এর যথাযথ রাজস্ব আদায় এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করন।
গ্যারেজ গুলো থেকে সরকারের বিদ্যুৎ এর যথাযথ রাজস্ব আদায় করন এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় করন চালকরা যদি বৈধভাবে টাকা দিয়ে চার্জ দেওয়ার নিশ্চয়তা পায়, তবে সরকারের বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ হবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ লাভবান হবে। ব্যাটারি টেকনোলজির আধুনিকায়ন (Lead-Acid থেকে Lithium-ion) পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন সস্তা অ্যাসিড ব্যাটারির বদলে পর্যায়ক্রমে হালকা, দীর্ঘস্থায়ী এবং দ্রুত চার্জ হওয়া লিথিয়াম-আয়ন (Lithium-ion) ব্যাটারি ব্যবহারে চালকদের উৎসাহিত করা হোক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এর মাধ্যমে উক্ত ব্যাটারি ব্যবহার সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করা কেননা লিথিয়াম ব্যাটারি চার্জ হতে কম বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং পরিবেশবান্ধব। এটি গ্রিন এনার্জি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার সাথে হুবহু মিলে যায়।
দাবি নং- ৬. সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সড়কে পৃথক 'লো-স্পিড লেন' (Low-Speed Lane) নির্ধারণ করন।
সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভেতরে তীব্র গণপরিবহন সংকট দূর করতে এবং প্রধান সড়কগুলোতে (Main Roads) শৃঙ্খলা ফেরাতে সুন্দর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এর সমাধান হিসেবে ঢাকার ভেতরের প্রধান সড়কগুলোর বাম পাশে ব্যারিকেড বা মার্কিংয়ের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট 'ধীরগতির যান্ত্রিক লেন' (Low-Speed Lane) বা সার্ভিস লেন তৈরি করা হোক। যদি পুরো সড়কে তা সম্ভব না হয়, তবে প্রধান সড়কের যে অংশগুলো দিয়ে অটোরিকশাকে এক অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পার হতে হয়, সেখানে নির্দিষ্ট ক্রসিং বা ওভারপাস পয়েন্ট নির্ধারণ করা হোক। এর ফলে প্রধান সড়কের দ্রুতগামী গাড়িগুলোর গতি যেমন বাধাগ্রস্ত হবে না, তেমনি অটোরিকশাগুলোও দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছাড়া শহরের অভ্যন্তরে মূল সড়কের বাম পাশ ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে।
দাবি নং- ৭. জাতীয় মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত ঢাকা সিটির প্রধান সড়কের বাম পাশে স্থায়ী 'প্লাস্টিক বা কংক্রিট ডিভাইডার' দিয়ে অটোরিকশার জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ করনঃ
ঢাকা শহরের হাইওয়ে-সংযুক্ত মেইন রোডগুলোর (যেমন: গাবতলী, যাত্রাবাড়ী বা উত্তরা) একদম বাম পাশে হলুদ রঙের প্লাস্টিক বা কংক্রিটের ছোট ছোট বর্ডার (ফিজিক্যাল ডিভাইডার) দিয়ে ৭/৮ ফিটের একটি ডেডিকেটেড লোকাল লেন তৈরি করা হোক। এই লেনের ভেতর দিয়ে অটোরিকশাগুলো হাইওয়ের দ্রুতগামী বাসের কোনো ক্ষতি না করে নিরাপদে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা যাতায়াত করতে পারবে।
দাবি নং- ৮. পরিবহন ব্যবস্থার আইনি কাঠামোতে অটোরিকশাকে সংযুক্ত করন।
অটোরিকশাকে সড়ক পরিবহন আইনের অধীনে এনে সিটি কর্পোরেশন বা বিআরটিএ (BRTA) ও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি করা হোক, যার অধীনে প্রতিটি রিকশার সরকারি নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স থাকবে। একই সাথে, কোনো অটোরিকশা যদি ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করে, কিংবা উল্টো পথে চলে, তবে সাধারণ বাস বা কারের মতোই তাদের বিরুদ্ধে বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত মামলা, জরিমানা করার আইনি ব্যবস্থা চালু করা যায়। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এরিয়ার মধ্যে যেন সিটির বাহিরের কোন গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যাপারে শক্ত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
দাবি নং- ৯. ৮ জোন বাতিল করে ঢাকাকে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিভক্ত করা এবং মেইন ও ফিডার রোড মিলিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে 'সর্বমোট ৫ লক্ষ্য অটোরিকশার সিলিং' নির্ধারণ:
ঢাকা মহানগরীকে জটিল ৮টি ভৌগোলিক জোনে ভাগ করলে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত এবং চালকদের রুট ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ ঢাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (DNCC) এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (DSCC)-এই দুটি আইনি ও প্রশাসনিক অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট করা হোক। বুয়েট ও বিআরটিএ (BRTA) এর রোড ক্যাপাসিটি এবং ২.৫/৩ কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ ট্রিপের চাহিদা বিবেচনা করে শহরের ফিডার রোড (অভ্যন্তরীণ সড়ক) ও প্রধান সড়কগুলোর নির্দিষ্ট 'লো-স্পিড লেন' মিলিয়ে সারাদেশের মেগাসিটিগুলোর ট্রাফিক মডেল অনুযায়ী ঢাকায় সর্বমোট ৫ লক্ষ্য অটোরিকশার চূড়ান্ত লাইসেন্স বা সিলিং নির্ধারণ করা হোক।
দাবি নং ১০: সড়ক ব্যবস্থাপনায় মালিক শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহন প্রসঙ্গঃ
অটোরিক্সা শ্রমিকদের উপরে সকল প্রকার শোষ্ণ, নিপীড়ন, জুলুম, চাঁদাবাজি এবং অযথা ডাম্পিং নামক হয়রানি বন্ধ করতে হবে এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সংগঠন গুলোকে আইনি প্রক্রিয়ায় ট্রেড ইউনিয়ন বা অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে নিবন্ধন দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক বিবেচনা করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে প্যাডেল চালিত যানবাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে।
সংগঠনের বক্তব্য:
ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ মনে করে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাতের সমস্যার স্থায়ী সমাধান কেবল নিষেধাজ্ঞা বা উচ্ছেদের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এই খাতকে প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক, নিরাপদ, নিবন্ধিত এবং আইনসম্মত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মাধ্যমে একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা-তিনটি বিষয়ই বিবেচনা করা সম্ভব।
সংগঠনটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়, উপরোক্ত ১০ দফা দাবি নিয়ে চালক-মালিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক।
সংগঠনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, চালক-মালিকরা আইন মানতে এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। প্রয়োজন কেবল একটি বাস্তবসম্মত, ন্যায়সঙ্গত ও অংশগ্রহণমূলক নীতিমালা।
আমাদের প্রত্যাশা
ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা বন্ধ নয়-আধুনিকায়ন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈধ ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।"
চালকের জীবিকা সুরক্ষা এবং যাত্রীর নিরাপত্তা-দুটিই নিশ্চিত করা হোক।"

মন্তব্য করুন