প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৭:৩৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশেষ প্রতিবেদক
আদালতের সমন এড়াতে ও সিআর মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকে পণ্ড করতে এক নামজাদা শিল্পপতিকে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ফরিদপুর শহরের গোহলক্ষ্মীপুর (আলামিন জামে মসজিদ সড়ক) এলাকায় জমি সংক্রান্ত পুরনো বিরোধকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি মো. সিদ্দিকুর রহমানের (৪৮) বিরুদ্ধে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকার চাঁদা দাবির এ রহস্যজনক মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলার কথিত অকুস্থলে ঘটনার দিন অভিযুক্ত শিল্পপতি উপস্থিতই ছিলেন না; তিনি তখন ঢাকায় নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। ঘটনাটি তদন্ত না করেই তড়িঘড়ি মামলা রেকর্ড করা এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও তদন্ত কর্মকর্তার রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে ফরিদপুরে চরম তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোহলক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মো. মজিবুর রহমান (৬৪) নিজের একটি জমি আইএফআইসি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ঋণ নেন। পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তিনি জমিটি বিক্রির উদ্যোগ নিলে আত্মীয় শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমান তা ক্রয়ের প্রস্তাব দেন। চুক্তি অনুযায়ী ব্যাংকের দেনা মেটানোর কথা থাকলেও ব্যাংকিং জটিলতায় জমিটি আদালতের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের নামেই নামজারি হয়ে যায়। মূলত এখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্বের সূচনা। ব্যাংক কর্তৃক জমি হাতছাড়া হওয়ার দায় শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমানের ওপর চাপিয়ে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় মজিবুর ও তাঁর পরিবার।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ অক্টোবর ২০২৫ ইং তারিখে শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমান বাধ্য হয়ে মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ফরিদপুর আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত বিষয়টি কোতোয়ালি থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিজ্ঞ আদালত মজিবুর রহমানকে আগামী ৩০ জুলাই আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন।
অভিযোগ উঠেছে, আদালতের সেই নিশ্চিত গ্রেফতার বা হাজিরা এড়াতেই অতি চতুরতার আশ্রয় নেয় মজিবুর রহমান ও তাঁর ছেলে মো. হামিদুর রহমান রবিন। তাঁরা গত ২৮ জুলাই ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় গিয়ে শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে একটি কাল্পনিক মামলা (মামলা নং ৫৬) ঠুকে দেন। মামলায় ঘটনার তারিখ দেখানো হয় ১৫ জুলাই (অন্য দাবিতে ১৩ জুলাই বিকেল সাড়ে চারটা)।
তবে ডিজিটাল আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজে বের হয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনার নির্দিষ্ট দিন ও সময়ে শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমান ফরিদপুরেই ছিলেন না। রাজধানীর পান্থপথে নিজ অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে তাঁর উপস্থিতি এবং ডিজিটাল এটেনডেন্সের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যিনি পান্থপথের অফিসে বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন, তিনি একই সময়ে ফরিদপুরে গিয়ে সশরীরে চাঁদা চাইলেন কীভাবে—তা নিয়ে শহরজুড়ে তোলপাড় চলছে। সিদ্দিকুর রহমানকে সামাজিকভাবে হেয় করতে ও আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতে মজিবুর ও তাঁর ছেলে একটি ভুয়া বা সাজানো কাগজ আলামত হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চালিয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগী শিল্পপতি সিদ্দিকুর রহমান চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "৩০ জুলাই আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ ছিল মজিবুরের। বিজ্ঞ আদালতের আইনি মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচতেই কারো কুপরামর্শে আমার বিরুদ্ধে এই ভিত্তিহীন চাঁদা দাবির নাটক সাজানো হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভূমিকা। প্রাথমিক কোনো তদন্ত বা আমাকে একটিবার ফোন করে যাচাই না করেই কীভাবে এত বড় একটি চাঁদাবাজির মামলা রুজু করা হলো? এমনকি থানার ওসি সাহেব কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজে অথবা নিজের পছন্দের লোক দিয়ে এর তদন্তভার গ্রহণ করেছেন, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক।"
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসানের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি। এমনকি থানা কার্যালয়ে টানা তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাঁর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
তবে থানার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক সুকান্ত দত্ত প্রতিবেদককে জানান, "বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই প্রকৃত সত্যতা উন্মোচিত হবে। এর আগে মন্তব্য করার সুযোগ নেই।"
আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিকে এভাবে পরিকল্পিত মামলায় জড়িয়ে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় স্থানীয় সুশীল সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। বিষয়টি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন ফরিদপুরবাসী।
মন্তব্য করুন