প্রকাশিত: ২০ ঘন্টা আগে, ১১:১৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
বিশেষ প্রতিবেদক
ব্যাংকিং নিয়মনীতি ও আমানতকারীদের আমানতকে জিম্মি করে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সিটি ব্যাংক’-কে নিজস্ব অপশাসনের আখড়ায় পরিণত করার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মাসরুর আরেফিন এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী মোতাসিম বিল্লাহ সিজনের বিরুদ্ধে। আর্থিক দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নারী সহকর্মীকে হেনস্তার গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ৯ মাসের মাথায় সিজনকে গোপনে ব্যাংকে ফিরিয়ে এনেছেন এমডি। এই ‘মাসরুর-সিজন অক্ষ’-এর একচ্ছত্র দাপটে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অনুসন্ধান ও সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে সিজনের রাজনৈতিক পরিচয় ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অডিওতে তাকে স্বকণ্ঠে বলতে শোনা যায়, "আমি নড়াইলে ছাত্র জীবনে শিবির করেছি। আমি শিবির করছি... আমার বাবা জামায়াত করে, আমার বাবা হচ্ছে একটা মসজিদের ইমাম।" নড়াইলে রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনে সাধারণ পদে যোগ দেওয়া সিজন মূলত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও সাবেক বিতর্কিত শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের কালো টাকা সংরক্ষণ ও বিদেশে পাচারের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করতেন।
ব্যাংকিং খাতে কোনো বিশেষ সাফল্য না থাকা সত্ত্বেও কেবল এমডি মাসরুর আরেফিনের বিশেষ অনুগ্রহে ২০২১ ও ২০২২ সালের মধ্যে একই বছরে দুটি প্রমোশন বাগিয়ে নেন সিজন। রাতারাতি তাকে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ও বনানী শাখার ব্যবস্থাপক পদে বসানো হয়। বিনিময়ে ব্যাংকের শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তোপ থেকে ব্যাংককে বাঁচাতে সাবেক প্রভাবশালী পুলিশ কর্তাদের স্বজনদের সিটি ব্যাংকে চাকরি উপহার দিত এই সিন্ডিকেট।
এই সিন্ডিকেটের বেপরোয়া স্বভাব চূড়ান্ত রূপ নেয় বনানী শাখায়, যখন সিজন এক নারী সহকর্মীর ওপর চরম অসৌজন্যমূলক ও অশালীন নির্যাতন চালান। ঘটনার বিষয়টি প্রকাশ পেলে সহকর্মীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে তাকে শোকজ করা হয়। তবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পদত্যাগের নাটক করেন সিজন। পরে তাকে তথাকথিত বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হলেও, কোনো বিচারিক বা দাপ্তরিক তদন্ত ছাড়াই ৯ মাসের মাথায় এমডি মাসরুর আরেফিন তার একক প্রভাবে গোপনে সিজনকে পুনর্বাসিত করেন। ব্যাংকের ভেতরের বড় বড় আর্থিক লুটপাট পরিচালনা এবং বাইরের প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার কাজে সিজন অপরিহার্য বলেই তাকে এভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ব্যাংকে যোগ দেওয়ার পর জ্যামিতিক হারে বেড়েছে সিজনের অবৈধ সম্পদ। ঢাকার আফতাব নগরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যৌথ মালিকানায় কোটি টাকার প্লট এবং প্রশাসনিক ভয়ভীতি দেখিয়ে আফতাব নগর সোসাইটি নির্বাচনে ভোট কারচুপির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ব্যাংকের খেলাপি গ্রাহকের জব্দ করা ৫২ লাখ টাকার টয়োটা হ্যারিয়ার গাড়ি নিজ নামে হাতিয়ে নেওয়া সরাসরি ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ (Conflict of Interest) ও ব্যাংক জালিয়াতির শামিল হলেও এমডির আশ্রয়ে তিনি পার পেয়ে যান। কোটি কোটি টাকা খরচ করে অভিজাত বনানী ক্লাব ও ঢাকা বোট ক্লাবের সদস্যপদও বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
স্বকণ্ঠে শিবিরের পরিচয় স্বীকার করা এবং দুর্নীতির একাধিক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে এমডির নিজ স্বার্থে পুনর্বাসনের ঘটনা পুরো ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। সিটি ব্যাংককে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে অবিলম্বে মাসরুর-সিজন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ব্যাংকের ক্ষুব্ধ কর্মী ও সাধারণ গ্রাহকেরা।
মন্তব্য করুন