প্রকাশিত: ৯ জুন, ২০২৪, ০২:১২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
আজ ৮ জুন শনিবার পিএসডিআই কনসালট্যান্সি, অ্যাসেড হবিগঞ্জ ও শেয়ার দ্যা প্লানেট, জাপান এর যৌথ উদ্যোগে পরিবেশ সুরক্ষা ও বাসযোগ্য সবুজ পৃথিবীর জন্য প্রয়োজন বহুমূখী ও সমন্বিত উদ্যোগ-শীর্ষক সরাসরি ও অনলাইনে একটি পরিবেশ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অ্যাসেড হবিগঞ্জের প্রধান নির্বাহী জাফর ইকবাল চৌধুরী, ফেইথ ইন অ্যাকশন এর নির্বাহী পরিচালক নৃপেন বৈদ্য, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, উপমা নারী কল্যাণ সংস্থা, কক্সবাজার এর নির্বাহী পরিচালক পাপিয়া দে, পরিবেশ সংগঠন পিপলস ভয়েস চট্টগ্রাম এর সভাপতি শরীফ চৌহান, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন-এর ফ্যাকাল্টি কো-অর্ডিনেটর সাইং সাইং উ নিনি, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা খাইরুল মামুন মিন্টু এবং উন্নয়ন গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী তুহিন সরকার।
নিখিল ভদ্র বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে উপকূলীয় এলাকার জীবন-জীবিকা আজ চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সাইক্লোন বা ঘুর্ণিঝড় থেকে রক্ষায় সুন্দরবন রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করছে। অথচ সুন্দরবন এলাকায় প্রাণ বৈচিত্র্য রক্ষায় তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যায় না, বরং ধ্বংসের অনেক ধরনের কার্যক্রম চলছে। সুন্দরবন এলাকায় প্রাণ বৈচিত্র্য রক্ষায় আশ্রয় প্রকল্পের ন্যায় পশুপাখিদের রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। একটি বাড়ি একটি খামারের অলোকে উপকূলের বাড়িগুলোকে আশ্রয় কেন্দ্রে রুপান্তর করার জন্য একটি বাড়ি একটি আশ্রয় প্রকল্প করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় বাজেট বরাদ্দ করেছে। কিন্তু সেই বরাদ্দ ব্যয়ের সুনিদিষ্ট কোন খাত নির্ধারণ করা হয়নি। বাজেট বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগনকে যুক্ত করতে হবে।
নৃপেন বৈদ্য বলেন, দূর্যোগ বিবেচনায় বিশ্ব ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা অনুদানের পরিবর্তে লোন হিসেবে দিতে আগ্রহী। যেখানে এই জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের দায় সবচেয়ে বেশি। উন্নয়নশীল দেশগুলো অস্ত্র খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী বেশি; পরিবেশ সুরক্ষায় তাদের কাজের আগ্রহ কম। অপরদিকে এই পরিবেশ ধ্বংসে আমরাও অনেকটা দায়ী। রেমালের কারণে উপকূলীয় এলাকার মানুষ এখনো পানিবন্দী অবস্থায় আছে। সরকারি উদ্যোগের কারণে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমে এলেও জীবন জীবিকার ওপর চরমভাবে প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় জনগনের সম্পৃক্তার মাধমে দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে কাজ করতে হবে।
পাপিয়া দে বলেন, রোহিঙ্গাদের বলপূর্বক দেশান্তরের ঘটনা অনেক দিনের। সমুদ্র ও পাহাড় সম্মিলন হওয়ায় এই এলাকার আলাদা একটা গুরুত্ব আছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে; হাতি চলাচলের পথ নষ্ট হয়েছে; পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে; কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে; অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে এলাকার প্রাণ প্রকৃতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই বিষয়গুলোর ওপর সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শরীফ চৌহান বলেন, নদী, পাহাড় ও সমুদ্রের চট্টগ্রাম আজ চরম ঝুঁকির মধ্যে। পাহাড় কাটা, নদী দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে চট্টগ্রাম আগের মতো আর নেই। নগরের বর্জ ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে; নদীর পানি দূষিত হচ্ছে; পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে; ভূমিধ্বস হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিবেশ উন্নয়নে সদিচ্ছার অভাবের কারণে চট্টগ্রাম শহর ক্রমান্বয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও মাদ্রাজ (চেন্নাই) শহর কর্তৃপক্ষ একসাথে নগর পরিকল্পনা করা হয়। চেন্নাই সেই মাস্টার প্ল্যানের সঠিক বাস্তবায়ন করে আজ বিশ্বের পরিবেশ বান্ধব নান্দনিক নগরীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ একের পর মাস্টার প্ল্যান করে চট্টগ্রামকে ধ্বংসের নগরীতে পরিণত করছে। এখন চট্টগ্রাম নগর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
সাইং সাইং উ (নিনি) বলেন, চট্টগ্রাম পার্বত্য জেলায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি নষ্ট হয়ে গেছে। ৮০% মানুষের নিজের কোন জমি নাই। এমনকি নির্দিষ্ট কোন পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক নাই। জীবন জীবিকার তাগিদে বৃক্ষ নিধন চলছে। অপরিকল্পিত কৃষি ব্যবস্থার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। কখনও কখনও বেসরকারি খাত বিশেষ করে পর্যটন শিল্পের বিকাশের নামে পার্বত্য এলাকার প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করছে। পার্বত্য এলাকার পরিবেশ সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ ও অংশগ্রহণমুলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। একটি পরিকল্পিত পর্যটন শিল্প তৈরী করা; যেখানে তরুণদের যুক্ত করা ও কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি পরিবেশ সুরক্ষায় ভুমিকা রাখবে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক ভিত্তিক সচেতেনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকর্মী কাজল বরণ ত্রিপুরা আরও যোগ করে বলেন, পাহাড়ে ছড়া বা নালা রক্ষাকারী বাঁশগাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। বন ধ্বংস করে ফলদ বাগান করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সঠিকভাবে বনায়ন করতে হবে; বৃক্ষরোপনের ক্ষেত্রে পানি সংরক্ষণকারী গাছ লাগাতে হবে। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে বাইরের গাছ লাগিয়ে অতিরিক্ত সার ও পেস্টিসাইড ব্যবহার বন্ধ করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অন্যদিকে বেশি লাভের আশায় যারা তামাক চাষ করে ভূমির উর্বরতা নষ্ট করছে। সে বিষয়ে নজর দেয়া উচিত। পাশাপাশি যারা অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করছে; তাদেরকে পরিবেশ ও কৃষি খাতের বিষয়ে সংবেদনশীল করতে হবে। ইটভাটা বন্ধে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ইটভাটা মালিকরা বন ধ্বংস করছে এবং কৃষি ও আবাদযোগ্য জমির মাটি কিনে নিচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকর্মী দয়ানন্দ ত্রিপুরা বলেন, বিভিন্ন অঞ্চলের সমস্যার ওপর ভিত্তি করে আলোচনা ও সচেতনতামূলক সেশন আরও প্রয়োজন। পরিবেশ সংরক্ষণে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবার সকল ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
উন্নয়ন গবেষক তুহিন সরকার বলেন, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল সম্পুর্ণভাবে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার শিকার। ফলে ক্রমাগত নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে; যা সম্পূর্ণভাবে কৃষি-অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার উপর প্রভাব ফেলছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষির অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে তিস্তা নদী। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ক্রমান্বয়ে মরুময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে সরকার গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে; যা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে নিয়ে যাবে। কৃষি শ্রমিকরা স্থানচ্যূত হচ্ছে ও নতুন পেশা বেছে নিচ্ছে। এ সমস্যা হতে উত্তরণে শুধু বাংলাদেশের কথা ভাবলে হবে না। এটিকে আঞ্চলিক সমস্য হিসেবে দেখতে হবে এবং আন্তঃদেশীয় নদী সম্পর্কিত চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন সবচেয়ে জরুরি।
জাফর ইকবাল চৌধুরী বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলের মধ্যে হাওর এলাকা অন্যতম। অথচ এটি সবচেয়ে উপেক্ষিত। মোট খাদ্যশস্যের মোট ৫ ভাগের ১ ভাগ আসে হাওর এলাকা থেকে। পাশাপাশি মিঠা পানির মাছের বড় জোগানও আসে হাওর থেকে। দেশের খাদ্যে চাহিদা মেটানোর অন্যতম সোর্স হচ্ছে হাওর। হাওরের নির্দিষ্ট একটি এলাকা প্রতি বছরই বিশেষ সময়ে পানির নীচে থাকে। যা মূলত প্রতিবেশী দেশের মানুষের প্রকৃতির উপর অত্যাচারের কারণে হয়। সামগ্রিকভাবে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ঘাটতি আছে, নদী ও খালে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। উজানের পানির কারণে এলাকা প্লাবিত হচ্ছে; যা প্রায় ২৫% খাদ্যশস্য নষ্ট হচ্ছে; যা সার্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। এজন্য পরিবেশ সুরক্ষায় খাল ও বিলগুলোর পূনঃখননের ব্যবস্থা করা দরকার। আরেকটি বিষয়, হাওর শুধুমাত্র সিলেট, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ বা মৌলভীবাজার নয়। হবিগঞ্জে আরও হাওর রয়েছে। সেগুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। দুযোগের সময় সমগ্র হাওর অঞ্চলকে চিহ্নিত করে সামগ্রিকভাবে কাজ করতে হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের ব্যক্তি পর্যায় থেকে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একমাত্র বহুমাত্রিক ও টেকসই সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমেই এই ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে ব্যক্তি থেকে শুরু করে কমিউনিটির লোকজন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকারসহ সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন